অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জোয়ার ঠেকাতে ইইউ সীমান্তে কড়াকড়ি

অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী হামলার হুমকির প্রেক্ষিতে সীমান্তে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো

ইউরোপ ডেস্কঃ বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) ইউরোপের ছয়টি ভাষায় প্রকাশিত অভিবাসন সংক্রান্ত অনলাইন পোর্টাল ইনফোমাইগ্র্যান্টস তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, নিজেদের মধ্যে সীমান্তে নজরদারি ও তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে তারা৷ নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষিত সময় পার হওয়ার পর তা ছয়মাস পর্যন্ত বাড়িয়েছে কোনো কোনো দেশ৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি শেঙেনভুক্ত দেশের মধ্যে অবাধে যাতায়াতের সুযোগ থাকে৷ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় না সীমান্তে৷ দেশগুলোর নাগরিকেরা এবং কোনো একটি দেশে বসবাসের অনুমতি থাকা অভিবাসীরা বিনা ভিসায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে পারেন ৷

তবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নিতে পারে দেশগুলো ৷ অনিয়মিত অভিবাসীদের যাতায়াত বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাসী হামলার হুমকির কারণে এখন সে ধরনের ব্যবস্থাই নিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ৷ জেনে নিন কোন দেশ কী ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করেছে সীমান্তে৷

অস্ট্রিয়া: স্থলবেষ্টিত অস্ট্রিয়ার সঙ্গে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন, জার্মানি, চেক রিপাবলিক, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া ও ইতালির সীমান্ত৷ গত অক্টোবরে দেশটি চেক রিপাবলিকের সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি বসিয়েছে ৷ সেটি ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকার কথা৷ নভেম্বরে স্লোভেনিয়া ও হাঙ্গেরি সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সময়সীমা আগামী বছরের মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে ৷ এজন্য আশ্রয়প্রার্থীদের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে চাপবৃদ্ধি, ইউক্রেন যুদ্ধের পর অস্ত্র চোরাচালান ও অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর হুমকি এবং মানবপাচারকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে৷

ডেনমার্ক: শেনজেন দেশগুলো থেকে আগতদের জন্য গত আগস্টে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ডেনমার্ক ৷ মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান পোড়ানোর ঘটনার পর কোপেনহাগেন বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে৷ ইইউ কমিশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেনিশ-জার্মান স্থল সীমান্ত ও দেশটি থেকে নৌপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নজরদারি ব্যবস্থা ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে ডেনমার্ক ৷

ডেনমার্ক সরকার জানিয়েছে, তারা অনিয়মিত অভিবাসী বৃদ্ধি, সন্ত্রাস ও সংগঠিত অপরাধ, বিদেশি গোয়েন্দা গুপ্তচরবৃত্তি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই উদ্যোগ নিয়েছে ৷

ফ্রান্স: নভেম্বরে শেনজেন দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্তে পুনরায় নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স৷ এজন্য সন্ত্রাসী হুমকিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা৷ পরিকল্পনা অনুযায়ী এই কড়াকড়ি আগামী বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বজায় থাকবে ৷

অক্টোবরে ব্রাসেলসে আততায়ীর হামলায় দুইজন নিহত হওয়ার পর ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানা বেলিজিয়াম সীমান্তে আবারো নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা দেন৷ বেলজিয়াম ছাড়াও ফ্রান্সের সাথে রয়েছে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইটালি, লুক্সেমবুর্গের সীমান্ত ৷

জার্মানি: অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে ১৬ অক্টোবর পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক ও সুইজারল্যান্ডের সাথে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা দেয় জার্মানি ৷ এর সময়সীমা ছিল ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৷ তবে সেদিন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ৷ ১৬ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পোল্যান্ড সীমান্তে ৩,৩০০টি অননুমোদিত প্রবেশ শনাক্ত করার পাশাপাশি ১১০০টি প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছে ৷

চলতি বছর দেশটিতে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে৷ বার্লিন অস্ট্রিয়ার সাথে সীমান্তে নিরাপত্তা তল্লাশি ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে ৷ আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ার উপর চাপ, নিরাপত্তা হুমকি এবং ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের প্রেক্ষিতে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকির প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছে বার্লিন ৷

ইতালি: ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় আবেদনকারী প্রবেশ করে ইতালিতে ৷ সাগরপথ ছাড়াও বলকান রুট হয়ে আসা অভিবাসীরা দেশটির উত্তর-পূর্ব স্থলসীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন ৷ তারই প্রেক্ষিতে স্লোভেনিয়ার সঙ্গে পুলিশের তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে ইটালি ৷ এজন্য সন্ত্রাসের হুমকিকে অবশ্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী দেশটি ৷ এই নিয়ন্ত্রণ অন্তত ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবে বলে জানিয়েছিল রোম ৷ তবে সেটি আগামী বছর পর্যন্ত অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি ৷

নরওয়ে: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না হলেও শেনজেন জোটে রয়েছে নরওয়ে ৷ ১২ নভেম্বর থেকে তারা শেনজেন অঞ্চলের দেশগুলোতে যাতায়তকারী জাহাজে নজরদারির জন্য বন্দরে পুনঃনিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছে ৷ সমুদ্র ও স্থল অবকাঠামোতে হামলার হুমকি ও বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা মোকাবিলায় এই উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে অসলো ৷ আগামী বছরের ৫ মে পর্যন্ত তারা এই নিয়ন্ত্রণ চালু রাখার কথা জানিয়েছে ৷

পোল্যান্ড-স্লোভাকিয়া: স্লোভাকিয়া থেকে অনিয়মিত অভিবাসীরা প্রবেশ করছে এমন কারণ দেখিয়ে পোল্যান্ড সীমান্তে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল ৷ তার মেয়াদ ছিল ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৷ অন্যদিকে স্লোভাকিয়া হাঙ্গেরির সঙ্গে সীমান্তে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে ৷ অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে দেশটির সরকার কঠোরতা অবলম্বন করছে ৷ নভেম্বরে সরকার জানিয়েছে ২০২২ সালের তুলনায় অনিয়মিত উপায়ে প্রবেশ করা অভিবাসীদের আটক ১০ গুণ বেড়েছে ৷

স্লোভেনিয়া: ১৭ নভেম্বর স্লোভেনিয়া শেনজেন দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণারোপ ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে৷ এই নিয়ন্ত্রণ আরো ছয়মাস বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে তারা ৷ তবে এজন্য ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সংঘাত পরিস্থিতিসহ সংগঠিত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের হুমকিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ৷ এর আগে অক্টোবরে স্লোভেনিয়া ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরির সীমান্ত পারাপার এলাকায় পুলিশ নিয়োজিত করে ৷

সুইডেন: আগস্ট থেকে সুইডেন সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে সুইডেন ৷ সীমান্ত পুলিশকে আগের চেয়ে বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে ৷ শরীরে তল্লাশি ও বাড়তি প্রযুক্তিগত নজরদারি ডিভাইস ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে তাদেরকে ৷ কোরান পোড়ানোর ঘটনার পর একইমাসে দেশটির সরকার সন্ত্রাসী হামলার হুমকির মাত্রা বাড়িয়েছে ৷ আগামী বছরের মে পর্যন্ত এই কড়াকড়ি সময়সীমা বাড়িয়েছে স্টকহোম ৷

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »