ইউরোপে আশ্রয়ের অধিকার নেই এমন লোকজনদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে এবং ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে বৈঠক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রীরা
ব্যুরো চীফ, অস্ট্রিয়াঃ বৃহস্পতিবার (২৬ জানুয়ারি) লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের পর আটক হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইইউ। তিন বছর আগে নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের পর শুধুমাত্র গাম্বিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। ইইউর নির্বাহী ইউরোপীয় কমিশন ইরাক, সেনেগাল ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ইইউর দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতার উন্নয়ন হয়েছে। তবে এরপরও ইইউ’র এই প্রত্যাবাসনের হার মাত্র ২১ শতাংশ।
অভিবাসন হচ্ছে ইউরোপীয় এই ব্লকের একটি অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। প্রত্যাবাসন বা অভিবাসনের বিষয়ে নিজেদের তত্ত্বাবধানের কাজটি কিভাবে ভাগ করে নেওয়া যায় তা নিয়ে কয়েক বছর আগে তিক্ত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল ইইউর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে। তাই বর্তমানে ওই দ্বন্দ্ব পুনরুজ্জীবিত করার চেয়ে প্রত্যাবর্তন বাড়ানোর পাশাপাশি অনিয়মিত অভিবাসন হ্রাস করার বিষয়ে আলোচনা করছে দেশগুলো।
ইইউ কমিশনের মন্ত্রীরা একটি আলোচনা পত্রে বলেছে, ‘প্রত্যাবাসনের জন্য একটি কার্যকর এবং সাধারণ ইইউ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হল সু-কার্যকর এবং বিশ্বাসযোগ্য অভিবাসন এবং আশ্রয় ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ।’ জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ ভূমধ্যসাগর পেরিয়েছি। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধ ও দারিদ্র্য কবলিত দেশগুলো থেকে পালিয়ে আসা মানুষগুলো ইউরোপে যাওয়ার জন্য এই পথ বেছে নিয়েছিল। রাশিয়ার হামলার পর গত বছর প্রায় ৪০ লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থী ইউরোপজুড়ে নিবন্ধিত হয়েছিল।
এদিকে অভিবাসন বিষয়ে ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন পোর্টাল ইনফোমাইগ্রান্টস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে ইইউ তাদের চাপ বাড়িয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবর্তন বাড়ানোর জন্য একটি নতুন কৌশল নিয়েছে। ইইউ সদস্য দেশগুলিকে একযোগে কাজ করার পাশাপাশি ফ্রন্টেক্সের মতো সংস্থাকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
গত মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) ইউরোপীয় স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিশনার ইলভা ইওহানসন বলেছেন, যে অভিবাসীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের বা সেখানে থাকার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারবেন না, তাদের দেশে ফিরে যেতে হবে।
ইলভা আরও বলেন, “যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার যোগ্য নন, তাদের অবশ্যই তাদের মূল দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রিটার্ন কোঅর্ডিনেটর মারি জুরিৎসচের সঙ্গে যুগ্মভাবে ব্রাসেলসে সংবাদ সম্মেলনের সময় একটি নতুন প্রত্যাবাসন কৌশলের কথা জানান, যাতে বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।
ব্লকটি বছরের পর বছর ধরে অনিয়মিত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আরো বেশি করে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করছে। ২০২১ এপ্রিলে, ইইউ কমিশন প্রাথমিকভাবে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনকারীদের কথা ভেবে একটি কৌশলের কথা জানিয়েছিল। ইউরোপীয় কমিশন অনুসারে শুধুমাত্র ২১ শতাংশ অভিবাসী যারা অনিয়মিতভাবে ইইউতে প্রবেশ করেছিল তারা মূল দেশে ফিরে এসেছে, এমনকি তাদের আশ্রয়ের আবেদন একটি সদস্য রাষ্ট্র দ্বারা প্রত্যাখ্যান করা হলেও।
ইউরোস্ট্যাট অনুসারে, ২০২১ একটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ ছেড়ে যাওয়ার আদেশের সঙ্গে জারি করা নন-ইইউ নাগরিকদের মোট সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৪২ বাজার ১০০ জন। ছেড়ে যাওয়ার আদেশের পর, ৮২ হাজার ৭০০ জন নন-ইইউ নাগরিককে অন্য দেশে (অন্যান্য ইইউ দেশগুলি সহ) ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন এবং অস্ট্রিয়া সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আশ্রয়ের আবেদন পেয়েছে।
ইইউ কীভাবে প্রত্যাবাসন বাড়াবে ? ইওহানসন জোর দিয়েছিলেন, প্রত্যাবাসনের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে অবশ্যই একযোগে কাজ করতে হবে পাশাপাশি ইউরোপীয় বর্ডার এবং কোস্ট গার্ড এজেন্সির মতো ইইউ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে হবে। ফ্রন্টেক্সের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে। যে সব দেশ প্রত্যাখ্যান করা আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে নিতে রাজি নয় তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্রাসেলস তাদের ভিসা নীতি ব্যবহার করতে চায়।
২০১৮ সালে প্রায় ৭০ শতাংশ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্য ছিল ব্রাসেলসের। শুধুমাত্র ইইউ সদস্য দেশগুলির সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন আলোচনা এগোতে পারে। তবে ইওহানসন কিংবা জুরিৎসচ এই নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস