দেশের প্রথম চিকিৎসাবিদ জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম

 রিপন শানঃ দেশের চিকিৎসাসেবাকে মানুষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার এক কিংবদন্তি  মহারথীর নাম অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষার সুফল যুগ যুগ ধরে ভোগ করছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। যে অসামান্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবাদপ্রতিম কিংবদন্তী অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিম যাত্রা শুরু করেছিলেন সেই সৃষ্টিই তাকে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্হান দিয়েছে ।
ডাক্তার মোহাম্মদ ইব্রাহিম । বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন জাতীয় অধ্যাপক। তার মূল নাম ‘শেখ আবু মোহাম্মদ ইব্রাহিম’। তিনি ১৯৬৫ সালে ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে বারডেম হাসপাতাল নামে পরিচিত। বাংলাদেশে ডায়াবেটিকস রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও এর প্রতিকারে তার অবদান অনস্বীকার্য। ড. ইব্রাহিম ১৯১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর ইউনিয়নের খাঁড়েরা গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।  তার পিতা শেখ মৌলভী মুহম্মদ কিসমতুল্লাহ এবং মায়ের নাম আজিম-উন-নিসা বিবি। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে ডা. ইব্রাহিম ছিলেন সবার বড়।
তার গ্রামের মধ্য বাংলা স্কুলে লেখাপড়া শুরু করার পর তিনি ‘সালার এডওয়ার্ড ইংলিশ হাইস্কুলে’ ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। তিনি (১৯৩৩-১৯৩৪) কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৩৮ সনে ডাক্তারী পরীক্ষায় পাশ করেন।  কলকাতা মেডিকেল কলেজ হতে ১৯৩৮ সালে ডাক্তারী পরীক্ষায় পাশ করে  ড. ইব্রাহিম কলকাতা মেডিকেল কলেজে প্রফেসর অব মেডিসিনের ওয়ার্ডে হাউস ফিজিশিয়ান হিসাবে কাজ করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত একই প্রতিষ্ঠানে তিনি ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসার ও প্র্যাকটিক্যাল ফার্মেসী বিভাগের সিনিয়র ডেমনসট্রেটর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশ বিভাগের পর অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন পদে যোগদান করেন। একই সাথে তিনি জেনারেল হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিনের শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৪৮ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম ইংল্যান্ড থেকে এম.আর. সি.পি. ডিগ্রী অর্জন করেন। তার পরের বছর আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানস থেকে এফ.সি.সি.পি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫০ সালে দেশে ফিরে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম ঢাকা মেডিকেল কলেজের এডিশনাল ফিজিশিয়ান হিসাবে যোগদান করেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও মেডিসিনের প্রফেসর নিযুক্ত হন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসেনের প্রফেসর ও অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে থাকাকালীন সময়ে ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী কতিপয় বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজসেবীদের সহযোগিতায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় পাকিস্তান ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে বারডেম হাসপাতাল নামের পরিচিত। বাংলাদেশে ডায়াবেটিক্স রোগ  সম্পর্কে সচেতনতা ও এর প্রতিকারে তার অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে তার অবদান চিরস্মরণীয়। দেশের মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে পুরো জীবন তিনি উৎসর্গ করে গেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখে গেছেন, কাজ করে গেছেন নিরন্তর।
পঞ্চাশের দশকেই ডা. ইব্রাহিম বুঝতে পেরেছিলেন, আসন্ন সময়ে ডায়াবেটিস হতে যাচ্ছে এ দেশের মানুষের অন্যতম বড় শত্রু। সত্তরের দশকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস (বারডেম)।
কালের বিবর্তনে সেই বারডেমই আজ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন। শুধু তাই নয়, ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল বারডেম জেনারেল হাসপাতাল। বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক কিংবা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি- দেশের সব ডায়াবেটিস হাসপাতালগুলো আজ জানান দেয় কত বিস্তৃত পরিসরে চিকিৎসা সেবার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন তিনি।
অথচ এই বিশাল বারডেম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল খুবই স্বল্প পরিসরে। কারণ অর্থ এবং স্থান সংকট দুটোই ছিল। ১৯৫৭ সালে সেগুনবাগিচায় মাত্র ৩৮০ স্কয়ার ফুটের একটি টিনের ঘরে ২৩ জন ডায়াবেটিক রোগী নিয়ে বহির্বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডা. ইব্রাহিম। কোনো রোগীর ভর্তির ব্যবস্থা না থাকায় কেবল বহির্বিভাগই স্থাপন করতে পেরেছিলেন তিনি।
১৩ বছর পরে ১৯৭০ সালে বহির্বিভাগে কয়েকটি বিছানা এখানে যুক্ত করে কিছু রোগী রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন ডা. ইব্রাহিম। তিনি রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের জন্য এক টাকাও ফি নিতেন না। ডা. ইব্রাহিম চেয়েছিলেন কোনো ডায়াবেটিক রোগী যেন বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়।
১৯৮০ সালে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে নতুন আঙ্গিকে স্থাপিত হয় বারডেম। সেগুনবাগিচার হাসপাতালটি সেখানে সরিয়ে আনা হলো। বারডেমই হলো এশিয়া মহাদেশের সর্বপ্রথম ডায়াবেটিসের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল।
শুধু হাসপাতালেই থেমে থাকেননি অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিম। হাসপাতাল যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় সেজন্য পর্যাপ্ত যোগ্য লোকবল তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বারডেম একাডেমি। বারডেমে এখন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন ও মেটাবলিজম বিষয়ে এমফিল, এমডি ও পিএইচডিসহ ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি কোর্স পরিচালনা করা হয়। রোগীদের আর্থিক অবস্থা ভেদে ওষুধ ও চিকিৎসায় ২৫ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্তও ছাড় দেয় বারডেম। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ও খাবারের সম্পূর্ণ খরচ বহন করে বারডেম কর্তৃপক্ষ। বারডেমে মোট ৬০টি বিভাগে এখন  ৫১৯ জন চিকিৎসক, ৬৩৯ জন নার্স ও আড়াই হাজারেরও বেশি কর্মচারি নিয়োজিত। এখন পর্যন্ত বারডেমে নিবন্ধনকৃত রোগীর সংখ্যা প্রায় পৌনে ৭ লাখ। প্রতিদিন ৩ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। কেবল বারডেম ও ডায়াবেটিক সমিতি নয়, একাধারে তিনি তৈরি করেছেন বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টিবিজ্ঞান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গড়েছেন পুনর্বাসন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ডা. ইব্রাহিম মন্ত্রীর পদমর্যাদায় স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করেন। চিকিৎসাবিদ্যায় অসাধারণ অবদানের জন্য এ মহান হিতৈষীকে ১৯৭৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিসাবে পরিচিত ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয় । ১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপক হন এবং দেশে তিনিই প্রথম চিকিৎসাবিদ যিনি এই মর্যাদা পান। ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও মানব হিতৈষী ড. মোহম্মদ ইব্রাহিম পরলোক গমন করেন।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক /ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »