বাংলাদেশে প্রথম মৃত মানুষের কিডনি দুজনের দেহে সফল প্রতিস্থাপন

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মৃত ব্যক্তির দান করা কিডনি অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে

বাংলাদেশ ডেস্কঃ গতকাল বুধবার(১৯ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার ভোররাত ৪টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) দুটি কিডনির একটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বলে হাসপাতালের জনসংযোগ বিভাগ থেকে দেশের সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশের জাতীয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে,২০ বছর বয়সী ব্রেন ডেথ রোগী সাহারা ইসলামের (মৃত) দেহ থেকে নেওয়া দুটি কিডনি দুজন কিডনি বিকল রোগীর দেহে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) এবং অন্যটি প্রতিস্থাপন করা হয় কিডনি ফাউন্ডেশনে।

প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপনে অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেন বিএসএমএমইউর রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার হাবিবুর রহমান। সফল
কিডনি প্রতিস্থাপনের পর তিনি জানান, ঢাকার বাসিন্দা সারা ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কে টিউমারসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তার শিক্ষক মা বলেন,তার মেয়ে সারা মৃত্যুর আগে তার দেহের সবকিছুই দান করে দিতে বলেছেন। তবে তার মৃত্যুর পর শুধুমাত্র কিডনি ও কর্নিয়া নেওয়া হয়েছে।

ডা.হাবিবুর রহমান আরও বলেন, সারা তিন দিন আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিএসএমএমইউতে ভর্তি হন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় তাকে ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষণা করা হয়। ডা.হাবিবুর রহমান আরও জানান, তার কিডনির সঙ্গে ম্যাচ করতে কয়েকজন কিডনি রোগীর তথ্য মেলানো হয়। এর মধ্যে ৩৪ ও ৩৭ বছর বয়সি দুই নারীর সঙ্গে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মিলে যায়। আত্মীয় না হওয়ায় এর বেশি মেলেনি। বাকিটা ওষুধ প্রয়োগে উপযোগী করা হয়েছে।

বিএসএমএমইউতে কিডনি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার দলে আরও ছিলেন হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক তৌহিদ মো. সাইফুল হোসাইন, সহযোগী অধ্যাপক ফারুক হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক কার্তিক চন্দ্র ঘোষসহ ১৫ চিকিৎসক।

তারা জানান, বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে দাতার কাছ থেকে কিডনি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অস্ত্রোপচারে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। এরপর কিডনিটিকে প্রতিস্থাপনযোগ্য করতে আধা ঘণ্টা লাগে। কিডনি প্রতিস্থাপনে সময় লাগে আরও দুই ঘণ্টা।

কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের অধ্যাপক একেএম খুরশিদুল আলমের নেতৃত্বে ৩৭ বছর বয়সি নারীর কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। মৃত ব্যক্তি বলতে এখানে ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষিত ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ‘ব্রেন ডেথ’ অনেক রোগী থাকেন। তারা আর বাঁচেন না। তাদের হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস ফ্লুইডের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে কিছুদিন চালু রাখা যায়।

অঙ্গদাতা সাহারা ইসলাম ১০ মাস বয়সে টিউমার স্কেলেলিস রোগে আক্রান্ত হন। এ রোগ নিয়ে দীর্ঘদিন লড়াই করেন। এ লড়াই করা অবস্থায় সাহারা ইসলাম অগ্রণী গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব ডেভলভমেন্ট আন্ট্রনেটিভে (ইউডা) ফাইন আর্টসে ভর্তি হন।

সাহারা ইসলাম ফাইন আর্টসের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। কোনো ব্যক্তি ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষিত হওয়ার পর কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ বা লিভার, অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) ও খাদ্যনালির মতো অঙ্গগুলো দান করলে অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে হৃৎপিণ্ড থেমে গেলেও কর্নিয়া, অস্থি, অস্থিমজ্জা ও চর্ম প্রতিস্থাপন করা যায়। এগুলোকে ক্যাডাভেরিক প্রতিস্থাপন বলা হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে,১৯৫৯ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে ব্রেন ডেথ মৃত ব্যক্তির কিডনি অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করার সফল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তারপর ক্রমান্বয়ে যুক্তরাজ্য সহ পাশ্চাত্য দুনিয়ার অধিকাংশ দেশেই এই ব্যবস্থায় কিডনি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত
ও শ্রীলঙ্কায় ইতিমধ্যেই এই প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক আকারে শুরু করা হয়েছে। তবে আমাদের বাংলাদেশে এই প্রথম মৃত ব্যক্তির দেহের কিডনি
অন্য মানুষের দেহে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হল।

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »