বিদ্যুতের দাম বাড়ল ৫ শতাংশ, সমন্বয় হবে প্রতি মাসে

মোঃ নাসরুল্লাহ, ঢাকা: খুচরা পর্যায় বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে। এতে বিভিন্ন ধাপ ও খাতে ইউনিট প্রতি ১৯ পয়সা থেকে এক টাকা করে বাড়বে বিদ্যুতের দাম। জানুয়ারি মাস থেকেই কার্যকর হবে বিদ্যুতের নতুন দাম। আর যেসব গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করেন তাদের এখন থেকেই এই দাম পরিশোধ করতে হবে। সরকারের নির্বাহী আদেশে বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।

এদিকে, এখন থেকে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সরকারের নির্বাহী আদেশে এই মূল্য সমন্বয় হবে। অর্থাৎ প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুতের মূল্য হয় কমবে না হয় বাড়বে। প্রতিমাসেই খুচরা পর্যায়ের গ্রাহককে নতুন দামে বিদ্যুৎ কিনতে হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

নতুন বছরের শুরুতেই বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে আবাসিক, সেচ, শিল্পসহ সব পর্যায়ের খুচরা গ্রাহকদের জানুয়ারি মাসের বিল পরিশোধের সময়ই বাড়তি টাকা গুনতে হবে।

নতুন দর অনুযায়ী আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা ৯৪ পয়সা করা হয়েছে। শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ১৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। যেসব গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহার ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের মধ্যে থাকবে তাদের বিল প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১ পয়সা করা হয়েছে। ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ৬ টাকা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ৩০ পয়সা এবং ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের জন্য ৬ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৬৬ পয়সা করা হয়েছে। ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৪৪ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের ওপরে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল ১১ টাকা ৪৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৩ পয়সা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আগে মাসে ডিমান্ড চার্জ ৩০ টাকা ছিল, এখন সেখানে বেড়ে হয়েছে ৩৫ টাকা।

আগে সেচ বা কৃষি কাজে ব্যবহৃত পাম্পের ক্ষেত্রে আগে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল চার টাকা ১৬ পয়সা। নতুন দর অনুযায়ী, এ খাতে দাম বেড়ে হয়েছে ৪ টাকা ৩৭ পয়সা। ডিমান্ড চার্জ ৩৫ টাকা, যা আগে ছিল ৩০ টাকা।

ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে এখন ফ্ল্যাট রেট ৮ টাকা ৯৬ পয়সা, অফ পিকে ৮ টাকা ৬ পয়সা এবং পিকে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা। আগে যা ছিল যথাক্রমে ৮ টাকা ৫৩ পয়সা, ৭ টাকা ৬৮ পয়সা এবং ১০ টাকা ২৪ পয়সা। ডিমান্ড চার্জ ৩০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০ টাকা।

নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১২ টাকার স্থলে এখন ১২ টাকা ৬০ পয়সা গুনতে হবে। শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের ক্ষেত্রে ইউনিট প্রতি নতুন দাম ৬ টাকা ৩২ পয়সা। আগে যা ছিল ৬ টাকা দুই পয়সা। রাস্তার বাতি ও পানির পাম্পের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ খরচ ৭ টাকা ৭০ পয়সার পরিবর্তে ৮ টাকা নয় পয়সা হলো।

এছাড়া ‘বাণিজ্যিক ও অফিস’ শ্রেণীতে ইউনিটপ্রতি ফ্ল্যাট রেট ১০ টাকা ৩০ পয়সার পরিবর্তে ১০ টাকা ৮২ পয়সা, অফ পিকে ৯ টাকা ২৭ পয়সার পরিবর্তে ৯ টাকা ৭৩ পয়সা ও পিক সময়ে ১২ টাকা ৩৬ পয়সার পরিবর্তে ১২ টাকা ৯৮ পয়সা দিতে হবে। মাসিক ডিমান্ড চার্জ ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৫ টাকা হয়েছে।

গত ২১ নভেম্বর পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়ায় বিইআরসি। এর ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে বিক্রি করছে ৬ টাকা ২০ পয়সা, যা আগে ৫ টাকা ১৭ পয়সা ছিল। পাইকারিতে দাম বৃদ্ধির আগে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান ওজোপাডিকো এবং পরে বিপিডিবি, আরইবি, ডেসকো, ডিপিডিসি, নেসকো খুচরা বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় (বৃদ্ধি) করতে আবেদন করে। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই তাদের আবেদনে (প্রস্তাব) বলছে পাইকারি দাম বৃদ্ধির পর খুচরা দাম না বাড়ালে তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। তারা ভোক্তা পর্যায়ে গড়ে ২০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি চেয়েছিল। ভোক্তা পর্যায়ে গড়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের বর্তমান দাম ছিল ৭ টাকা ১৩ পয়সা। গণশুনানিতে বিইআরসির কারিগরি কমিটি তা ১ টাকা ১০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৩ পয়সা করার বা ১৫.৪৩ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। তবে বৃহস্পতিবার সরকারের নির্বাহী আদেশে খুচরা বিদ্যুতের মূল্য গড়ে ৫ শতাংশ বাড়ানো হলো।

এদিকে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধি দেশে চলমান মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি জনগণের কষ্ট বাড়িয়ে দেবে। তিনি বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেম লস, অনিয়ম বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের কারণে নিত্যপন্য ও উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফিতিতে। ফলে সার্বিক অর্থনীতিতে একটা ধাক্কা লাগবে। এছাড়া সামনে গ্যাসের দাম বাড়াতে পারে সরকার। ফলে আবার আরেকদফা বাড়বে বিদ্যুতের দাম।

গত বছরের ২১ নভেম্বর পাইকারি পর্যায়ে সবশেষ বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। ওই সময় পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয় ৬ টাকা ২০ পয়সা, যা আগে ছিল ৫ টাকা ১৭ পয়সা।

ঢাকা/ইবিটাইমস/আরএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »