আজ ১৬ ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস

 কবির আহমেদঃ আজকের এই দিন বাঙ্গালী জাতির এক গৌরবোজ্জ্বল মহা অর্জনের দিন। দীর্ঘ নয় মাস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটে।

১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ তৎকালীন রেস কোর্স ময়দানে(বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের
পর থেকেই পাকিস্তান শাষক গোষ্ঠীর সাথে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষের চূড়ান্ত বিভাজন শুরু হয়ে যায়।

পাকিস্তানের তৎকালীন স্বৈরাচারী স্বৈরশাসক গোষ্ঠী বুঝতে পারে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাঙ্গালী জাতি আর পাকিস্তানের আদেশ নিষেদ বা আনুগত্য
মানবে না। তাই তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর বাহুবল প্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করবে।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সেই নীল নকশা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ মাঝরাত থেকে “অপারেশন সার্চ লাইট ” নামে প্রথমে ঢাকায় পরে
ক্রমান্বয়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানের ঘুমন্ত বাঙ্গালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই এক কাল রাতেই পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী কয়েক হাজার নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হত্যা করে।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতেই ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান
নিয়ে কারাগারে বন্দি করে রাখে। ইত্যবসরে সেই ২৫ শে মার্চের কাল রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড
বাঙ্গালী অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পরে অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী অফিসার ও সৈনিকরা ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের চীফ ইন কমান্ড লে.কর্নেল জানজুয়া সহ পাকিস্তানী অন্যান্য অফিসার ও সৈনিকদের প্রথমে আটক এবং পরে হত্যা করা হয়।

পরবর্তীতে ২৭ শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার(রেডিও) কেন্দ্রের কালুরঘাট কেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজের নামে এবং পরে বঙ্গবন্ধুর নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সাহায্য কামনা করেন। এই ঘোষণার পরের দিন ২৮ শে মার্চ পাকিস্তান বিমান বাহিনী কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। পরে জানা গেছে এই বোমা হামলার ফলে একাধিক বাঙ্গালী সেদিন শাহাদাত বরণ করেন।

পরবর্তীতে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিব নগরে গঠিত তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে পরিচালিত দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্যে দিয়ে বিশ্ব-মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান আর দুই লাখ মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে এবং ৭ কোটি বাঙ্গালীর আত্মনিবেদন ও গণবীরত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরাধীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পায় বাঙ্গালী জাতি।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তির মহামন্ত্রে উজ্জীবিত করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পথ বেয়ে ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ, ’৫৬-এর সংবিধান প্রণয়নের আন্দোলন, ’৫৮-এর মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফার আন্দোলন, ‘৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’, ’৬৯-এর রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থান, ৬-দফাভিত্তিক ১৯৭০ সালে ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন হয়ষ

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন প্রভৃতি ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত লক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠে বাঙালি জাতি।

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে এবং পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

১৬ ডিসেম্বর বীর বাঙালির বিজয় দিবস। এ বছর দিনটিতে বাঙালি জাতি বিজয়ের ৫১ বছর পূর্ণ করছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সকল দেশপ্রেমিক মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে যথাযথ মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর ও জাকজমকপূর্ণভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে।

জাতীয় পর্যায়ে বিজয় দিবসের কর্মসূচির মধ্যে আছে— সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।

সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরস্থ জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ হবে। রাষ্ট্রপতি এতে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রীও এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।

দিনটি সরকারি ছুটির দিন। সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাসমূহ আলোকসজ্জায় সজ্জিত হবে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙ্গালী জাতি পরাধীনতার শিকল ভেঙে প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে। ২৪ বছরের শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতির ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় এক নতুন সূর্য।

বি/ইবিটাইমস/এম আর 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »