আগামী রবিবার ২০ নভেম্বর কাতারের স্থানীয় সময় বিকাল ৫ টায় স্বাগতিক কাতারের সাথে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরের খেলার মাধ্যমে বিশ্বকাপ ২০২২ এর পর্দা উঠবে
স্পোর্টস ডেস্কঃ মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির দেশ কাতার ২০১০ সালে ফিফা কর্তৃক ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশের ঘোষণার পর থেকেই এই বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। মরুভূমির দেশ কাতারের এই বিশ্বকাপ ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অনেক নতুনত্বের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় দৈনিক প্রথম আলো সাবেক ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ডেভিড বেকহামের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছেন ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের মৌসুমের মাঝে বিশ্বকাপ হওয়ায় খেলার মধ্যেই আছেন ফুটবলাররা, যা প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের জন্য ভালো হবে বলে মনে করেন ডেভিড বেকহাম। ‘২৫টির মতো ম্যাচ খেলার পর ফুটবলাররা বিশ্বকাপে নামছেন। এ সময় তাঁদের দম থাকার কথা সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এ কারণে কাতারের মাঠে এমন খেলা দেখা যাবে, যা সম্ভবত আগের কোনো আসরে দেখা যায়নি।’
কাতার বিশ্বকাপে, আমরা যে আটটি নতুন বিশেষত্ব দেখতে পেয়েছি.সে সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করছি।
১.ফিফা বিশ্বকাপ এই প্রথম শীতকালে: ফিফা বিশ্বকাপের আগের সব আসরই অনুষ্ঠিত হয়েছিল জুন-জুলাইয়ে। নজিরবিহীনভাবে এবার সেটা পাল্টে গেছে। খেলা হতে যাচ্ছে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে(২০ নভেম্বর-১৮ ডিসেম্বর)। মূলত কাতারের মরুভূমির তপ্ত জলবায়ুর কারণেই এবারের আসর শীত মৌসুমে সরিয়ে আনা হয়েছে।
২. মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বিশ্বকাপ: কাতারই মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ, যারা ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়, আরববিশ্বেও কাতারই প্রথম। এশিয়ায় অবশ্য এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। প্রথমবার হয়েছিল ২০০২ সালে, যৌথভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে।
আরববিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি বলেছেন, ‘করোনা মহামারির পর গোটা বিশ্বকে একত্র করার প্রথম বড় টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে কাতার বিশ্বকাপ। আরববিশ্বের ব্যতিক্রমী এক বিশ্বকাপ আয়োজন করতে কাতার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
৩. প্রথম টেকনো বল: কাতার বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হবে অ্যাডিডাসের তৈরি বল ‘আল রিহলা’। বাংলায় যার অর্থ ‘ভ্রমণ’। চামড়ায় তৈরি বলটিতে আছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। বলের নিখুঁত গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এর ভেতরে ৫০০ হার্জ আইএমইউ সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
যে তথ্য ব্যবহার করে নিখুঁত সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রযুক্তিসম্পন্ন বল ব্যবহার করা হচ্ছে এবারই প্রথম।
৪. প্রথম সেমি-অটো অফসাইড প্রযুক্তি: ২০১৮ বিশ্বকাপে ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। কাতারে অফসাইডের সিদ্ধান্ত হবে আরও নিখুঁত। চালু হচ্ছে সেমিঅটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। প্রতিটি স্টেডিয়ামের ছাদের নিচের অংশে ১২টি ট্র্যাকিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
কোনো খেলোয়াড় অফসাইড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও ম্যাচ অফিশিয়ালদের কাছে অফসাইড সংকেত চলে যাবে। গত বছর ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং ফিফা আরব কাপে সেমি-অটো অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে বিশ্বকাপ ফুটবলে এই প্রথম।
৫. ফুটবলারদের জন্য ডেটা অ্যাপ: ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের আরও বিশ্লেষণী ও নিখুঁত তথ্য পেতে সংযোজন করা হয়েছে ডেটা অ্যাপ। ৩২টি দলের প্রতিটি ফুটবলার ম্যাচের পর নিজের খেলাসম্পর্কিত তথ্যগুলো দেখতে পারবেন। ডেটার মধ্যে থাকবে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ কোন মুহূর্তে তিনি কেমন খেলেছেন, বল পায়ে কেমন ছিলেন, কতটুকু কী প্রচেষ্টা ছিল।
এই অ্যাপটি সম্পর্কে ফিফার ফুটবল টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন ডিরেক্টর জোহানেস হোলসমুলার বলেছেন, ‘মাঠের যারা মূল কারিগর, তাদের জন্য সম্ভাব্য সেরা প্রযুক্তির ব্যবস্থা করেছে ফিফা।’
৬. প্রথম ‘অল গ্রিন’ যানবাহনব্যবস্থা: কার্বন-নিরপেক্ষ বিশ্বকাপ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল কাতারের সুপ্রিম কমিটি ফর ডেলিভারি অ্যান্ড লিগ্যাসি। এ জন্য যাতায়াতে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাসের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। ইলেকট্রিক বাসগুলো ৪৪টি মেট্রোলিংক এবং ৪৮টি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট রুটে চালানো হবে। আয়োজক কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, বিশ্বকাপের মাধ্যমে চালু হওয়া পরিবেশবান্ধব যানবাহনব্যবস্থা কাতারের যাতায়াতব্যবস্থায় টেকসই হবে।
৭. প্রথম ‘আঁটসাঁট’ বিশ্বকাপ: কাতার বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো একটি অপরটির খুবই কাছাকাছি। মাত্র ৫৫ কিলোমিটার জায়গার মধ্যে আটটি স্টেডিয়ামের অবস্থান। ভৌগোলিকভাবে এটিই সবচেয়ে ‘আঁটসাঁট’ জায়গার বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে আর কখনো এত অল্প জায়গার মধ্যে সব ভেন্যু ছিল না।
স্বল্প জায়গার মধ্যে সব কটি মাঠের অবস্থান থাকায় খেলোয়াড়দের ভ্রমণক্লান্তি কমবে বলে মনে করেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডেভিড বেকহাম, ‘খেলোয়াড়দের জন্য এটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার। আগের বিশ্বকাপেও প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়েছিল। ম্যাচের পর আবার প্রস্তুত হয়ে ওঠাটা সহজ নয়। এই বিশ্বকাপ খেলতে আমার ভালোই লাগত।’
৮. প্রথম নারী রেফারি: এবারই প্রথম ছেলেদের বিশ্বকাপে নারী রেফারি ম্যাচ পরিচালনা করবেন। ৬৪টি ম্যাচের জন্য মোট ৩৬ জন প্রধান রেফারির নাম ঘোষণা করেছে ফিফা। এর মধ্যে নারী আছেন তিনজন। ছেলেদের বিশ্বকাপে রেফারিং করতে যাওয়া এই রেফারিরা হচ্ছেন জাপানের ইয়োশিমি ইয়ামাশিতা, ফ্রান্সের স্টিফানি ফ্রাপার্ট ও রুয়ান্ডার সালিমা মুকানসাঙ্গা।
এ তিনজনের পাশাপাশি অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ব্রাজিলের নিউজা বেক, মেক্সিকোর কারেন ডিয়াজ মেদিনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথরিন নেসবিত।
এদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে কাতার বিশ্বকাপে পর্যটকদের সেবা দেবেন ৮,০০০ হাজার বাংলাদেশী চালক। ইতিমধ্যেই কাতারের রাজধানী দোহায় বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে রেখে বাংলাদেশি গাড়িচালকদের ভাষাগত দক্ষতা ও আদবকেতাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দোহায় বাংলাদেশ দূতাবাসে সম্প্রতি তিন সপ্তাহের এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আরব নিউজের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে বলে জানিয়েছে দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।
২০ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক মাস ধরে চলবে এ ফুটবল আসর। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ কাতার সফর করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফুটবল ভক্তদের কাতারে স্বাগত জানাতে যেসব কর্মী নিযুক্ত থাকবেন, তাঁদের মধ্যে গাড়িচালকেরাও আছেন। বিভিন্ন ট্যাক্সি কোম্পানি ও রাইড শেয়ারিং কোম্পানিতে কর্মরত গাড়িচালকদের মধ্যে প্রায় আট হাজার বাংলাদেশি আছেন।
এমন অবস্থায় দোহায় বাংলাদেশ দূতাবাসে সম্প্রতি বাংলাদেশি চালকদের আদবকেতার উন্নয়ন ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বাড়ানোর জন্য তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালানো হয়েছে। কাতারের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষকেরা ১৫টি পরিবহন কোম্পানিতে কর্মরত ৪২০ জন অংশগ্রহণকারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। যাঁরা সশরীর উপস্থিত থাকতে পারেননি, তাঁদের জন্য অনলাইনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল।
দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান আরব নিউজকে বলেন, ‘আমাদের চালকেরা যদি পর্যটকদের ভালো সেবা দিতে পারেন, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্যও ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং হবে।’ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী চালকদের একজন আবদুল মোতালেব প্রায় এক দশক ধরে কাতারে কাজ করছেন। মোতালেব বলেন, ‘যাত্রীদের সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ করতে হবে, তা নিয়ে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যাত্রীদের কোন ভাষায় অভ্যর্থনা জানাতে হবে, তা নিয়ে আমাদের কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটা যে কতটা সহায়ক হয়েছে, তা আমি বলে প্রকাশ করতে পারব না।’
সাইদুল ইসলাম নামের আরেক চালক বলেন, প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর জড়তা কাটাতে পেরেছেন। বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে জড়তা দূর হয়েছে। সাইদুল বলেন, ‘আগে আমি ইংরেজিতে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেতাম। প্রশিক্ষণের পর কাজটি সহজ হয়ে গেছে।’
চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে তাঁরা অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন। ভবিষ্যতে অন্য খাতে কর্মরত বাংলাদেশিদেরও এ ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস