আজ ১৬ নভেম্বর কিংবদন্তি চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব সুভাষ দত্তের দশম মৃত্যুবার্ষিকী

রিপন শান: দেশীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি পুরুষ  সুভাষ দত্ত একসঙ্গে একজন দক্ষ অভিনেতা, পরিচালক ও আঁকিয়ে। বিনয়ী ও প্রাণখোলা মানুষটি নিজের সিনেমার নামের মতোই বাংলা চলচ্চিত্রে ‘ডুমুরের ফুল’ । বরেণ্য এ মানুষটির ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বুধবার। ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।
সুভাষ দত্তের জন্ম দিনাজপুরে মামা বাড়িতে। ১৯৩০ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি তার জন্ম। দিনাজপুরে ছিল তার মামার বাড়ি। বাবা মায়ের বাড়ি ছিল বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে। আঁতুড় ঘর থেকে পরবর্তী শৈশব-কৈশোর কেটেছে তার মামা বাড়িতে। সে অর্থে বাবার বাড়ি ছিল তার কাছে অনেকটাই অচেনা। মূলত লেখাপড়ার জন্যই তাকে মামার বাড়িতে রাখা হয়। সুভাষ দত্তের ডাক নাম পটলা। ভাল নাম সুভাষ চন্দ্র দত্ত। তার পৈতৃক বাসস্থান বগুড়া জেলার চকরতি গ্রামে। বসবাস করতেন পুরান ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের নিজ বাড়িতে। স্ত্রী সীমা দত্ত ২০০১ সালের অক্টোবরে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, দুই মেয়ে, পুত্র-পুত্রবধূ, নাতি নাতনী রেখে গেছেন। বড় ছেলে শিবাজী দত্ত দেশে থাকেন, আর ছোট ছেলে রানাজী দত্ত থাকেন সুইডেনে। বড় মেয়ে শিল্পী দত্ত বরিশাল এবং ছোট মেয়ে শতাব্দী দত্ত রংপুর স্বামীর বাড়িতে। শ্রী সুভাষ দত্তের ভাই বোনেরা ৫ জনঃ শ্রী সুভাষ দত্ত (সবার বড়), শ্রীমতি আরতী ধাম (মৃত, সন্তানাদি ভারতে বসবাস করছেন), শ্রী বিকাশ দত্ত (সুভাষ দত্তের ইউনিটের প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন তার জীবনের সর্বশেষ ছবি পর্যন্ত, স্ত্রী পুত্র কন্যা সমেত একই ভবনের আলাদা ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন), গীতু তরফদার এবং ডাঃ শ্রীমতি ঝরনা দত্ত (পেশায় চিকিৎসক, সুভাষ দত্তের মৃত্যু অবধি তার পাশে ছিলেন)।
শৈশবে নাটকে অভিনয় এবং নাট্য নির্দেশনা দিলেও সুভাষ দত্তের পেশাগত জীবন শুরু হয় একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসাবে। ১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দেখে তিনি ছবি নির্মাণে দারুণভাবে আগ্রহী হন। চলতে থাকে প্রস্তুতি। এর মধ্যে এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিটিতে প্রথম কমেডিয়ান হিসেবে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এর পর কেটে যায় কয়েকটি বছর। ১৯৬২ সালের শেষ দিকে এসে হঠাৎ তার মনে হয় তিনি তো অভিনয় করতে আসেননি। শচীন ভৌমিকের একটি গল্পের চিত্রনাট্য সৈয়দ শামসুল হককে দেখালেন। তিনি বললেন সব ঠিক আছে।
এরপর সত্য সাহার সঙ্গে তার কথা হলো। তিনিই চট্টগ্রামের একটি মেয়ের কথা বললেন। নায়িকা নির্বাচিত হলো। ছবিও শেষ। মুক্তি পেলা ‘সুতরাং’ ১৯৬৪ সালের ২৩শে এপ্রিল। ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী আর চট্টগ্রামে চারটি প্রিন্ট দিলেন। ছবি সুপারহিট। হিট এ ছবির নায়িকা কবরীও। সুভাষ দত্ত অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো রাজধানীর বুকে, সূর্যস্নান, চান্দা, তালাশ, নতুন সুর, রূপবান, মিলন, নদী ও নারী, ভাইয়া, ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো, ক্যায়সে কাহু, আখেরি স্টেশন, সোনার কাজল, দুই দিগন্ত, সমাধান প্রভৃতি। তার নির্দেশিত ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সুতরাং, কাগজের নৌকা, আয়না ও অবশিষ্ট, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, আবির্ভাব, বলাকা মন, সবুজ সাথী, বসুন্ধরা, সকাল সন্ধ্যা, ডুমুরের ফুল, নাজমা, স্বামী স্ত্রী, আবদার, আগমন, শর্ত, সহধর্মিণী, সোহাগ মিলন, পালাবদল, আলিঙ্গন, বিনিময়, আকাঙ্ক্ষা, ও আমার ছেলে ইত্যাদি। তিনি গত বছরের মার্চ মাসে কিউট চ্যানেল আই আয়োজিত চলচ্চিত্র মেলায় আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। তার হাত ধরেই চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে কবরী, সুচন্দা, উজ্জল, শর্মিলী আহমেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, আহমেদ শরীফ ও মন্দিরার। ১৯৭৭ সালে ‘বসুন্ধরা’ ছবিটির জন্য পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সুভাষ দত্ত। এরপর ১৯৯৯ সালে একুশে পদকও অর্জন করেন তিনি। এছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সম্মানর্জন করেন।
সুভাষ দত্ত ১৬ নভেম্বর, ২০১২ , শুক্রবার ১২ রামকৃষ্ণ মিশন রোড়, ঢাকার নিজ ফ্ল্যাট ৫ম তলার সত্যাশ্রয়ে সকাল ৭টায় ৮২ বছর বয়সে হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ১৭ নভেম্বর সকাল ৯টায় তার মৃতদেহ নিজ বাসভবন থেকে থেকে নিয়ে যাওয়া হয় রামকৃষ্ণ মিশনে এবং সেখানে ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান শেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। তার মৃতদেহ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রাখা হয় শহীদ মিনারে। এ সময় পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, কবি, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ এখানেই তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এবং সেখানে তার স্মরণে খোলা হয় একটি শোক বই। গুণী এই শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক বইয়ে অনেকেই লিখেন শিল্পীর গৌরবের কথা। শহীদ মিনারে তাকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অর্নার প্রদান করা হয়। শহীদ মিনার থেকে তার মৃতদেহ দুপুরে নিয়ে যাওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)-তে। সেখানে তাকে একনজর দেখার জন্য এফডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিল্পী, কলাকুশলীরা ভিড় জমান। এফডিসিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তার মৃতদেহ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় পোস্তগোলা শ্মশানে। এবং সেখানেই চির শায়িত করা হয় তাকে।
সুভাষ দত্তকে স্মরণ করতে গিয়ে হালের খ্যাতিমান পরিচালক দীপংকর দীপন বলেন- সুভাষ দত্ত বাংলা চলচ্চিত্রের যুগজয়ী মহাপুরুষ।  নির্মান অভিনয় শিল্পায়ন চলচিত্র শিল্পের সর্বত্রই তিনি একজন সফল মানুষ।  দশম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক/ইবিটাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »