স্বপ্ন এবং চ্যালেঞ্জের পদ্মা সেতু

পর্ব-১

  ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ  ১। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অর্জন হলো ১৯৭১ সনে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের মহান স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতার ৫১ বছর পর আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্জন হলো দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল এবং নানামুখী প্রতিকূলতা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সফলভাবে মোকাবেলা করে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ স্থাপনা পদ্মা সেতু নির্মাণ। এই সেতু নির্মাণের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও জাতিকে আরও একবার বিজয়ের স্বাদ উপহার দিলেন। এই সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা, রূপকার এবং বাস্তবায়নকারীও তিনি নিজে।                                                                                                                                                                                                      

২। জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং গোত্র নির্বিশেষে সবাই জানেন, মানেন এবং স্বীকার করেন – স্বাধীনতা বিরোধী কতিপয় দালাল, রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শাম্স ব্যতিরেকে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বিগত ১৯৭০ সনে অখণ্ড পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে এই মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁরই নামে এবং তাঁরই দিকনির্দেশনার আলোকে পরিচালিত হয়েছে এই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তিনি সশরীরে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও তিনিই ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা এবং অফুরন্ত প্রেরণার চিরন্তন উৎস। তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকারের সুদক্ষ পরিচালনায় এবং আপামর জনসাধারণের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের মহান স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করেছি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

৩। অত্যন্ত বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, সুমহান স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় ৫১ বছর সময়ে বাঙালি জাতির গৌরবদীপ্ত অর্জনের প্রায় সবকিছুই অর্জিত হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের মাধ্যমে ভারত এবং বার্মার (মিয়ানমার) বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক মোকদ্দমায় জয়লাভ করে সমুদ্রসীমা অর্জনের কৃতিত্ব আওয়ামী লীগের। ভারতের সাথে ছিটমহল সমস্যার সমাধান সহ সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ১৯৭২ সনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেছেন। এই চুক্তিকে গোলামীর চুক্তি বলে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি ও দল সমূহের পাশাপাশি কতিপয় উগ্র বামপন্থী দল সমূহ ও অত্যন্ত তীব্র ভাষায় সুদীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, জাতির জনক কর্তৃক সম্পাদিত উপরোক্ত মৈত্রী চুক্তির আলোকেই তদীয় কন্যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত সফলভাবে ভারতের সাথে সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি করেছেন। পৃথিবীর বহু দেশেই এহেন সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।

৪। এদেশের জনগণ নিশ্চয়ই জানেন ১৯৯৮ সনের ২৩শে জুন যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সেতু উদ্বোধনের পর উত্তরাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জীবনমান বহুলাংশে পাল্টে গিয়েছে। এই অঞ্চলের সাংবাৎসরিক বিড়ম্বনা “মঙ্গা” ইতিমধ্যেই দূর হয়েছে। এরই পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এবং স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর দারিদ্র্য ইতিমধ্যে অনেকটা ঘুচে গিয়েছে। এমতাবস্থায় উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্য পীড়িত মানুষগুলো এখন কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় অবাধে যাতায়াত করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে সীমান্ত সংলগ্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কর্মবিমুখ মানুষগুলো এখন কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে। এরই প্রভাবে তাদের রুটি রুজির সংস্থান হয়েছে। তাই এককালের কর্মহীন এবং সহায় সম্বলহীন মানুষগুলো এখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সচেষ্ট এবং সচেতন হয়েছে। যা খুবই আশাব্যঞ্জক এবং প্রেরণাদায়ক।

৫। যমুনা সেতু উদ্বোধনের পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের নিমিত্তে এতদ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য প্রমত্তা পদ্মা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। এরই পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষদের পক্ষ থেকেও সেতু নির্মাণের জন্য জোরালো দাবি উঠতে থাকে। এহেন অবস্থায় সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য শেখ হাসিনা Japan International Cooperation Agency (JAICA) -কে দায়িত্ব দেন। এমতাবস্থায় ১৯৯৮ সন থেকে ২০০০ সন পর্যন্ত এই সম্ভাব্যতা যাচাই চলে। এহেন যাচাইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সনের ৪ঠা জুলাই জনগণের ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার ভিতর দিয়ে প্রধানমনন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

৬। পরবর্তীকালে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বহুমুখী ষড়যন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারসাজিতে ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা পরাজিত হন এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতাসীন হয়। এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পদ্মা সেতুর স্থান মাওয়া-জাজিরা থেকে সরিয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। এমতাবস্থায় এই সরকারের আমলে ২০০৪ সনের জুলাই মাসে জাইকা তাদের সম্ভাব্যতা রিপোর্ট দাখিল করে। বর্তমানে নির্মিত মাওয়া এবং জাজিরা এলাকা ব্যতিরেকে অন্য কোথাও এই সেতু নির্মাণ করা সম্ভব নয় বলে জাইকা তাদের উপরোক্ত রিপোর্টে সুস্পষ্টভাবে অভিমত ব্যক্ত করে। এহেন অবস্থায় উপরোক্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর ঐ সময়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য কোন প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এই সরকার পুরো ৫ (পাঁচ) বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সেতু নির্মাণের নিমিত্তে তারা কোন প্রকার উদ্যোগ ও গ্রহণ করেননি।

৭। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তীকালে এই সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেন। এই সরকারের তত্ত্বাবধায়নে ২০০৭ সালে Asian Development Bank -এর সহায়তায় সেতুর নকশা তৈরীর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় উপরোক্ত ২০০৭ সনের আগস্ট মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (ECNEC) -এর সভায় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা অনুমোদিত হয়। তারও পরে ২০০৮ সালে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারই পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের নিমিত্তে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করেন। উপরোল্লিখিত দু’টি কার্যক্রম সম্পন্ন করা ব্যতিরেকে এই সরকারের মেয়াদকালে তারা আর আগাতে পারেননি। তাই এই সরকারের আমলেও পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

৮। সচেতন দেশবাসী নিশ্চয়ই জানেন আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই আওয়ামী লীগের প্রভাবাধীন তথা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তাই আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য কোন সরকারই এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কখনো আন্তরিক ছিলেন না। এই মর্মে তারা কখনো দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ ও গ্রহণ করেননি। তাই বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এবং কথার মারপ্যাঁচে যতই মিথ্যাচার এবং চাপাবাজি করুন না কেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এই অঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কোন উন্নয়ন হউক কিংবা পদ্মা সেতু নির্মিত হউক – তা তারা কোনভাবেই চাননি। তাই এই সেতু নির্মাণের ব্যাপারে তারা কোন প্রকার উদ্যোগ কিংবা কোন পদক্ষেপই নেননি। এরই পাশাপাশি স্বল্প মেয়াদী ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষেও উপরোক্ত দু’টি কার্যক্রম গ্রহণ ব্যতিরেকে আর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করার নিমিত্তে কোন সুযোগ কিংবা কোন অবকাশ ও তারা পাননি।

৯। প্রসঙ্গক্রমে আরও বলা আবশ্যক যে, এই ড. ফখরুদ্দিন সরকারের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিগত ২০০৮ ইং সনের ২৯শে ডিসেম্বর দেশে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছিল। এহেন অবস্থায় ২০০৯ সনের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার শপথ গ্রহণ করেন। এই শপথ গ্রহণের পর মাত্র ২২ দিনের মাথায় শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজে মনোনিবেশ করেন। এহেন অবস্থায় উপরোক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত নকশা প্রণয়নকারী সংস্থাকেই শেখ হাসিনা সরকার ও চূড়ান্তভাবে নকশা প্রণয়নের জন্য নিয়োগ প্রদান করেন। এমতাবস্থায় ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ করার নিমিত্তে চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ পুনরায় শুরু করা হয়।

১০। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে পদ্মা সেতু প্রকল্প হাতে নেয়ার পর থেকে এই সেতু বিরোধী এক শ্রেণীর মানুষ এবং রাজপথে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি-র প্রতিটি নেতাকর্মী বিভিন্নভাবে এই সেতুর বিরোধিতা করেছেন। টিভি চ্যানেলগুলির প্রতিটি টকশোতে সুযোগ পেলেই বিনপির নেতৃবৃন্দ সেতু বিরোধী বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন এবং অপপ্রচার চালিয়েছেন। সেতুর খরচ নিয়ে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি হয়েছে বলেও তারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে কোন ভালো কাজ করা খুবই কঠিন ব্যাপার। এখানে কেউ কোন ভালো কাজ করতে গেলে তাকে কোন প্রকার উৎসাহ না দিয়ে সংঘবদ্ধ ভাবে তাকে পিছনে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে যে, কয়েকজন জাপানি একত্রিত হলে তারা একটি উন্নয়নমূলক কাজ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক একত্রিত হলে তারা একটি ক্লাব গড়ে তুলেন। পক্ষান্তরে কয়েকজন বাঙালি একত্রিত হলে তারা পরনিন্দা এবং পরচর্চায় মেতে উঠেন। আবার কখনো বা নিন্দা মন্দ এবং ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হন। কোন একজনকে উপরে উঠতে দেখলে দশজন মিলে তাকে টেনে নামাতে চেষ্টা করেন। পদ্মা সেতুর ব্যাপারেও ঠিক তাই হয়েছে।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট  

(চলবে)

বি /ইবিটাইমস/এম আর

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »