হাঙ্গেরি মধ্য ইউরোপের একটি ইইউ সদস্য দেশ

১৮৬৭ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত “অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাজ্য” নামে মধ্য ইউরোপে একটি সম্মিলিত রাজত্বের অস্তিত্ব ছিল। ভিয়েনা ছিল সেই রাজত্বের প্রাণকেন্দ্র

 কবির আহমেদ, ভিয়েনা, অষ্ট্রিয়াঃ হাঙ্গেরীয় প্রজাতন্ত্র মধ্য ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। হাঙ্গেরির অধিকাংশ এলাকা দানিউব (Donau) উপত্যকা তথা হাঙ্গেরীয় সমভূমিতে অবস্থিত। এই সমতলভূমির ভেতর দিয়ে দানিউব নদী প্রবাহিত হয়েছে। হাঙ্গেরির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর বুদাপেস্ট দানিউব নদীর উভয় তীরে অবস্থিত। শহরটি পূর্ব মধ্য ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। হাঙ্গেরির বর্তমান সীমানা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ত্রিয়াননের চুক্তিতে ১৯২০ সালে নির্ধারিত হয়।

অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি যৌথভাবে মধ্য ইউরোপে একটি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাজ্য (অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি নামেও পরিচিত) বলতে একটি দ্বৈত রাজত্ব বা দ্বৈত রাষ্ট্রকে বোঝায়। ১৮৬৭ থেকে ১৯১৮ সাথ তথা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত মধ্য ইউরোপে একটি সম্মিলিত রাজত্ব হিসেবে এই দ্বৈত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল। ১৮০৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত কেবল অস্ট্রীয় সম্রাজ্য নামে একটি রাজত্ব ছিল। ১৮৬৭ সালে সেখানকার ক্ষমতাসীন হাবসবুর্গ রাজবংশ এবং হাঙ্গেরীয় নেতৃত্বের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। এই সমঝোতার ফলেই “অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাজ্যের” আবির্ভাব ঘটেছিল।

হাঙ্গেরির রাজধানীর নাম বুদাপেস্ট।এটি দেশের বৃহত্তম নগরী বা বসতি। হাঙ্গেরির সরকারি ভাষা হাঙ্গেরীয় ভাষা।দেশটির সরকার সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত আছে।হাঙ্গেরির বর্তমান রাষ্ট্রপতির নাম জানিস আদের এবং সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন ভিক্টর অরবান।

হাঙ্গেরির আয়তন ৯৩,০৩০ বর্গ কিলোমিটার। হাঙ্গেরির জনসংখ্যা আনুমানিক এক কোটির সামান্য বেশী। দেশটির বার্ষিক জিডিপি (পিপিপি) আনুমানিক ২,০৮.১৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং বার্ষিক মাথাপিছু আয় ২০,৭০০ ডলার।হাঙ্গেরি ২০০৪ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ)সদস্য দেশ।

হাঙ্গেরির জনগণ নিজেদেরকে “মজর” (Magyar) নামে ডাকে। মজরেরা ছিল এশিয়া থেকে আগত যাযাবর গোষ্ঠী। ৯ম শতাব্দীর শেষভাগে আরপাদের নেতৃত্বে মজরেরা দানিউব ও তিসজা নদীর মধ্যবর্তী সমভূমি জয় করে, যা বর্তমান হাঙ্গেরীয় সমভূমির মধ্যভাগ। ১১শ শতকের শুরুর দিকেই মজরেরা রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হয় এবং খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। হাঙ্গেরির প্রথম রাজা ছিলেন প্রথম স্টিফেন (১০০০ খ্রিষ্টাব্দ)। ১০৮৩ সালে তাকে সাধু ঘোষণা করা হয়।

১৪শ শতকে বিদেশী শাসকেরা হাঙ্গেরি জয় করে। ১৪শ ও ১৫শ শতক ধরে বিভিন্ন ইউরোপীয় রাজবংশ হাঙ্গেরি শাসন করে। এরপর ১৬শ ও ১৭শ শতকে দেশটির অধিকাংশ ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের দখলে। এসময় দেশটির পশ্চিমের কিয়দংশ অস্ট্রিয়ার হাব্‌সবুর্গ রাজবংশ নিয়ন্ত্রণ করত। ১৭শ শতকের শেষভাগে এসে হাব্‌সবুর্গেরা প্রায় সমস্ত হাঙ্গেরি দখলে নিতে সক্ষম হয়। হাঙ্গেরীয়রা ১৮৪৮ সালে হাব্‌সবুর্গদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, কিন্তু তা দমন করা হয়।

১৮৬৭ সালে দুই পক্ষ সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে একটি দ্বৈত সাম্রাজ্য গঠন করে, যার নাম দেয়া হয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য বিলীন হয়ে যায় এবং হাঙ্গেরি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরিতে সাম্যবাদী সরকার ক্ষমতা দখল করে এবং দেশটি সোভিয়েত-অনুগত দেশগুলির কাতারে যোগ দেয়। ১৯৯০ সালের নির্বাচনের পর একটি অ-সাম্যবাদী সরকার ক্ষমতায় আসে।

রোমান ক্যাথলিক ধারার খ্রিস্টধর্ম হাঙ্গেরির প্রধান ধর্ম, তবে এখানে বেশ বড় একটি প্রোটেস্ট্যান্ট ধারার সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায় রয়েছে। সাম্যবাদী শাসনের সময় সরকার সমস্ত ধর্মালয় বন্ধ করে দেয় এবং ধর্মালয়গুলির সম্পত্তি কেড়ে নেয়। বর্তমানে প্রায় অর্ধেক লোক রোমান ক্যাথলিক এবং এক-পঞ্চমাংশ প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বী। প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে বেশির ভাগই হাঙ্গেরীয় ক্যালভিনবাদী বা হাঙ্গেরীয় লুথারবাদী। ইউনিটারি ও অর্থডক্স গির্জাও রয়েছে এখানে।

হাঙ্গেরিতে প্রায় ১ লক্ষ বেশি ইহুদী বাস করে; এরা বেশির ভাগই রাজধানী বুদাপেস্ট ও তার আশেপাশে বাস করে। বুদাপেস্ট শহরে ইউরোপের বৃহত্তম ইহুদী মন্দির বা সিনাগগ অবস্থিত। ইহুদীরা ১১শ শতক থেকে এখানে বাস করছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হাঙ্গেরিতে ৮ লক্ষেরও বেশি ইহুদী বাস করত। হিটলারের সময় এবং পরবর্তীতে সাম্যবাদী শাসনের সময়ও ইহুদী বিদ্বেষী নীতির কারণে অনেকেই হাঙ্গেরি ছেড়ে চলে যায়।

ভৌগোলিকভাবে হাঙ্গেরি কিছুটা ডিম্বাকৃতির। দেশটি পূর্ব-পশ্চিমে সর্বাধিক প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এবং উত্তর দক্ষিণে সর্বাধিক প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত। হাঙ্গেরির উত্তরে স্লোভাকিয়া, উত্তর-পূর্বে ইউক্রেন, পূর্বে রোমানিয়া, দক্ষিণে সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো, ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া, এবং পশ্চিমে অস্ট্রিয়া অবস্থিত।

হাঙ্গেরি প্রায় পুরোটাই সমতল ভূমি। দানিউব নদী উত্তর-পশ্চিমে হাঙ্গেরি-স্লোভাকিয়া সীমান্তের কিয়দংশ গঠন করেছে। সেখান থেকে নদীটি দক্ষিণে রাজধানী বুদাপেস্টের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হাঙ্গেরিকে দুইটি সাধারণ অঞ্চলে ভাগ করেছে। দানিউবের পূর্ব পাড়ে অবস্থিত অঞ্চলটি একটি নিম্ন, ঢেউ খেলানো সমভূমি যা বৃহৎ হাঙ্গেরীয় সমভূমি বা বৃহৎ Alföld নামে পরিচিত।এই সমভূমিটি পূর্বে রোমানিয়াতে এবং দক্ষিণে সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোতে বিস্তৃত।

উত্তর-পশ্চিম হাঙ্গেরিতে অবস্থিত অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকার সমভূমিটির নাম ক্ষুদ্র Alföld এবং এটি স্লোভাকিয়া পর্যন্ত চলে গেছে। বৃহৎ Alföld সমভূমিটি হাঙ্গেরির তিন-চতুর্থাংশ এলাকা গঠন করেছে। এটি পুরোপুরি সমতল নয়। পশ্চিম দিকে এটি বেশ পাহাড়ি আকার ধারণ করেছে। এটি হাঙ্গেরির প্রধান কৃষিভূমি। এখানে ভুট্টা, গম, সূর্যমুখী, মিষ্টি বিট, লাল মরিচ ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হয় এবং এখানকার তৃণভূমিতে ভেড়া চরানো হয়। চারণভূমিগুলি puszta নামে পরিচিত।

হাঙ্গেরীয় লোকগীতি, নৃত্য ও সাহিত্যে এই puszta গুলিতে উনিশ শতকের রাখাল ও তাদের গবাদি পশুর পাল নিয়ে অনেক বর্ণনা আছে। ক্ষুদ্র সমভূমিটিও উর্বর এবং এখানে ব্যাপক চাষাবাদ হয়। সমভূমিগুলিকে পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বে দিকে পর্বতের সারি ঘিরে রেখেছে। উত্তর সীমান্তের উচ্চভূমিগুলি Esztergom-এ দানিউব নদীর গিরিখাত থেকে পূর্বে বিস্তৃত হয়েছে এবং মাত্রা পর্বতমালা গঠন করেছে, যা কার্পেথীয় পর্বতমালার একটি অংশ। দানিউবের পশ্চিমের অঞ্চলটি আন্তঃদানিউবিয়া নামে পরিচিত। এখানে উত্তর-পশ্চিমের ক্ষুদ্র সমভূমি ছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ দেখতে পাওয়া যায়। দক্ষিণে রয়েছে Mecsek পর্বতমালা, উত্তরে অরণ্যাবৃত বাকোনি পর্বতমালা, যার কাছেই রয়েছে বালাতন হ্রদ।

বাংলাদেশ-হাঙ্গেরি সম্পর্ক: বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরির মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে। দু’দেশের সম্পর্ককে আন্তরিক হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং উভয় দেশ তাদের এই আন্তরিকতাকে আরও জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করছে। উভয় দেশেরই আবাসিক রাষ্ট্রদূত নেই। অস্ট্রিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও স্থায়ী মিশন হাঙ্গেরির দায়িত্ব পালন করছে।

বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরি সাথে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে উভয় দেশের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ আছে এবং তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।হবাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সিরামিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং তৈরি পোশাকগুলি হাঙ্গেরীয় বাজারে বিপুল সম্ভাবনাযুক্ত পণ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাঙ্গেরিয়ান ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং দু’দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উন্নতির সম্ভাব্য উপায়গুলি অনুসন্ধান করার জন্য তাদের প্রতিনিধি দলের আদান প্রদান রয়েছে।অনেক বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী হাঙ্গেরিতে বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করছেন।

অন্যদিকে  রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী এবং এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলির অন্যান্যদের সাথে বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীরা ইইউ,পশ্চিম ইউরোপ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলিতে পৌঁছানোর জন্য হাঙ্গেরিকে একটি ট্রানজিট দেশ হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশীদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোক হাঙ্গেরিতে বসতি স্থাপন করেছে। ইউএনএইচসিআর হাঙ্গেরিতে বহুসংস্কৃতি ও অভিবাসীদের প্রচারে একটি বাংলাদেশ পরিবারকে প্রচারণায় ব্যবহার করেছিল।

কবির আহমেদ, লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »