অস্ট্রিয়ায় কি সমগ্র দেশের জন্য অভিন্ন করোনা বিধিনিষেধ আসছে ?

করোনার নতুন প্রাদুর্ভাবে কঠোর বিধিনিষেধ আসলেও স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত

ইউরোপ ডেস্কঃ আজ ভিয়েনায় অস্ট্রিয়ার বর্তমান করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা.ভল্ফগাং মুকস্টাইন (গ্রিনস) এবং শিক্ষামন্ত্রী হাইঞ্জ ফ্যাসমান (ÖVP)।

বর্তমানে সরকার করোনার চতুর্থ প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালের আইসিইউ বেডের রোগীর উপর ভিত্তি করে করোনার মোকাবেলার ৫ ধাপের বিধিনিষেধ বা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। দেশে করোনার সংক্রমণের বিস্তার বিস্ফোরণের আকার ধারণ করায় অস্ট্রিয়ার কেন্দ্রীয় ফেডারেল সরকার দেশের ৯ টি রাজ্যের গভর্নরদের সাথে আগামী পড়শু শুক্রবার এক জরুরী বৈঠকে বসছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন যেহেতু সমগ্র দেশেই করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে তাই শুক্রবারের বৈঠকে সমগ্র দেশের জন্য অভিন্ন বা একই রকম বিধিনিষেধ ঘোষণা করা হতে পারে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভল্ফগ্যাং মুকস্টাইন সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, আজ বুধবার তিনি মন্ত্রী পরিষদের নিয়মিত বৈঠকে করোনার বর্তমান অবস্থা ও পরবর্তী করণীয় পদক্ষেপগুলি নিয়ে ফেডারেল রাজ্য সমূহের গভর্নরদের সাথে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান যে,দেশে হঠাৎ করেই করোনার সংক্রমণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি “অবশ্যই” একটি সমস্যা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনার সংক্রমণের গতি অস্বাভাবিক গতিতে বাড়লেও সরকারের ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার উপরেই গুরুত্ব আরোপ করেছেন।তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে, করোনা ব্যবস্থা সহ একটি পরিষ্কার এবং স্বচ্ছ ধাপে ধাপে পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছিল।বিভিন্ন রাজ্য সমূহে বিভিন্ন বিধিবিধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ম্যাকস্টেইন বলেন,প্রায় সমগ্র অস্ট্রিয়াতেই করোনার সার্বিক অবনতির ফলে সমগ্র দেশেই এক অভিন্ন নতুন বিধিনিষেধ আসতে পারে।

তিনি আরও জানান, গতকালই অস্ট্রিয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে রোগীর সংখ্যা ৩০০ শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে, ফলে সোমবার থেকে সরকারের পরিকল্পিত দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন আগামী সোমবার অস্ট্রিয়ায় আইসিইউ রোগীর সংখ্যা ৪০০ শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে, ফলে শুক্রবারের বৈঠকে সরকারের পরিকল্পিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপ এক সাথে প্রয়োগ করা হতে পারে।

তবে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এই ধীরগতি বিধিনিষেধ তেমন কোন কাজে না আসায় কয়েকটি রাজ্য আরও কঠোর বিধিনিষেধ চাচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবার এও জানান, দেশে করোনার সংক্রমণের বিস্তার অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও পূর্বাঞ্চলের ভিয়েনা ও বুর্গেনল্যান্ড রাজ্যের অবস্থা কিছুটা ভালো। শুক্রবার ফেডারেল রাজ্যগুলির সাথে পরবর্তী পদক্ষেপগুলি নিয়ে আলোচনা করা হবে, দেশের বর্তমান ও পরবর্তী বিধিনিষেদগুলির “নিরাপদ” নিয়ে।

বর্তমান করোনা সংখ্যা সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী, মন্ত্রী পরিষদের নিয়মিত বৈঠকের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাথে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন অস্ট্রিয়ার শিক্ষামন্ত্রী হাইঞ্জ ফ্যাসম্যান (ÖVP) বলেন,স্কুলগুলিতে বর্তমান করোনার প্রচলিত ব্যবস্থার সাথেই থাকবে। যেমনটি তিনি শরতের ছুটির শেষের আলোকে বলেছিলেন। এই সপ্তাহে সংক্রমণের সংখ্যা “খুব উল্লেখযোগ্যভাবে” বেড়েছে, যা ফ্যাসম্যানের জন্য একটি ইঙ্গিত যে স্কুলে পরীক্ষা ব্যবস্থা একটি “মহামারী মোকাবেলায় অপরিহার্য হাতিয়ার”। স্কুলগুলোতে এখন আবার পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।  মন্ত্রী নিশ্চিত ছিলেন যে স্কুলগুলিতে পরীক্ষা ব্যবস্থা “অত্যন্ত শক্তিশালী” এবং ভালভাবে সেট আপ করা হয়েছে এবং স্কুলগুলি খোলা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার জন্য এটি এভাবেই চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলেও স্কুল অব্যাহত খোলা থাকবে বলে জানিয়েছেন।

শিক্ষামন্ত্রী ফ্যাসম্যান করোনার ধাপে ধাপে পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের পরিকল্পিত ধাপ ৩ থেকে উচ্চতর।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে  এফ এফপি২ মাস্ক পরার নিয়ম বাধ্যতামূলক হবে।এটি সাধারণ ধাপে ধাপে পরিকল্পনার তৃতীয় স্তরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না, তবে এটি করোনা কমিশনের উপর নির্ভর করছে।করোনা কমিশন আগামীকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে মিলিত হবেন।

যাইহোক, যখন শিক্ষামন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, স্কুলে অল্প বয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মুখোশের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী তা অস্বীকার করেছিলেন – এমনকি যদি টিকাটি কেবল বারো বছর বয়স থেকে পাওয়া যায়। ফ্যাসম্যান আশা করেন, আগামী মাসগুলিতে পরিস্থিতি আরও সহজ হয়ে যাবে যদি ছোট শিশুদের জন্য করোনার প্রতিষেধক টিকাও অনুমোদিত হয়।

এদিকে অস্ট্রিয়ার জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদল SPÖ থেকে সমালোচনা এসেছে: “স্বাস্থ্যমন্ত্রী এখন বুঝতে পারছেন যে, করোনার জন্য অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।এটি একটি জাতীয় সমস্যার অংশ। SPÖ এর প্রধান ডা.পামেলা রেন্ডি-ভাগনার প্রায় দেড় বছর ধরে কেন্দ্রীয় করোনা ব্যবস্থাপনার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছেন। আজ স্থানীয় একটি সম্প্রচার কেন্দ্রে SPÖ দলের ক্লাবের উপ প্রধান জর্গ লেইচফ্রাইড একথা জানান।

তিনি বলেন,দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত পিসিআর পরীক্ষা বা কর্মী না থাকলে এটি ফেডারেল সরকারের দায়িত্বের উপর পড়ে। সরকারকে অবশ্যই নিজেকে পরিষ্কার করতে হবে না, তবে তার দায়িত্ব অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে।এটি “হতাশাজনক এবং ক্লান্তিকর যে মহামারীর ২০ তম (!) মাসে, চতুর্থ তরঙ্গে, আমরা এখনও দেখতে পাচ্ছি যে, কোয়ালিশন সরকার কিভাবে খুব দেরিতে এবং খুব দ্বিধায় প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।”

এদিকে আজ অস্ট্রিয়ায় নতুন করে করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন ৬,৫০৬ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ২০ জন।রাজধানী ভিয়েনায় আজ নতুন করে সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন ৮০৫ জন।

অস্ট্রিয়ার অন্যান্য ফেডারেল রাজ্যের মধ্যে OÖ রাজ্যে ১,৬৬৯ জন, NÖ রাজ্যে ১,৩৩৭ জন, Steiermark  রাজ্যে ৯০৩ জন, Tirol রাজ্যে ৫৮৯ জন, Salzburg রাজ্যে ৪৪৪ জন, Kärnten রাজ্যে ৩৩৮ জন, Vorarlberg রাজ্যে ২৪১ জন এবং Burgenland রাজ্যে ১৮০ জন নতুন করে করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন।

অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী আজ সমগ্র অস্ট্রিয়ায় করোনার প্রতিষেধক টিকা দেয়া হয়েছে ১৫,৭২২ ডোজ এবং এই পর্যন্ত মোট করোনার প্রতিষেধক টিকাদানের পরিমাণ ১,১১,৯২,৩০৯ ডোজ।অস্ট্রিয়ায় এই পর্যন্ত করোনার প্রতিষেধক টিকার সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেছেন মোট ৫৭ লাখ ৩১ হাজার ৫৮১ জন,যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬৪,২ শতাংশ।

অস্ট্রিয়ায় এই পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮,৪৭,৪০৮ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১১,৪০০ জন।করোনার থেকে এই পর্যন্ত আরোগ্য লাভ করেছেন মোট ৭,৮৪,০৮৮ জন। বর্তমানে করোনার সক্রিয় রোগীর সংখ্যা ৫১,৯২০ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে আছেন ৩৩৩ জন।বাকীরা নিজ নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে আছেন।

কবির আহমেদ /ইবিটাইমস

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »