স্বপ্নের দেশ অস্ট্রিয়ায় ‘৭০ এর দশক থেকে বাংলাদেশীদের বসবাস

অস্ট্রিয়া ভৌগোলিক ভাবে মধ্য ইউরোপের আল্পস পর্বতমালার উপরে অবস্থিত একটি দেশ। বর্তমানে অস্ট্রিয়ায় নতুনদের জন্য আসা এবং থাকা প্রায় অসম্ভব

 কবির আহমেদ, ভিয়েনা, অষ্ট্রিয়াঃ অষ্ট্রিয়ায় ১৯৯৫ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসাবে নিবন্ধিত হয়েছেন। ইইউতে প্রবেশের পূর্বে অস্ট্রিয়া পূর্ব বা পশ্চিমের কোন জোট বা সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন না। দেশটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দেশ হিসাবে ঘোষণা দেয়ার পর এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতিসংঘের দফতর এবং তার অধীনস্থ আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশন বা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সদর দফতর,আন্তর্জাতিক তেল উৎপাদনকারী দেশ সমূহের সংস্থা ওপেকের(OPEC) সদর দফতর সহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিস এই দেশে অবস্থিত।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রথম সেই সময় ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ থেকে প্রথম জাতিসংঘের দফতরে চাকরী নিয়ে কয়েকজন প্রথম অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায়  আসেন। মূলত বাংলাদেশীরা ‘৮০ এর দশকের শেষ এবং ‘৯০ এর দশকের শুরুতে সবচেয়ে বেশী পরিমানে অস্ট্রিয়ায় এসেছেন।

৮০ এর দশকে অস্ট্রিয়ার আসতে কোন ভিসার প্রয়োজন হতো না। সে সময় বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য শুধুমাত্র পোর্ট এন্ট্রি ছিল অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে বিমানের টিকেট কিনে ফ্লাই করে ভিয়েনা বিমানবন্দরে এসে অস্থায়ী ভিসা নিয়ে প্রবেশ করা। এর ফলে সে সময় ভিয়েনার জাতিসংঘের দফতরে যারা চাকরি করতেন,তাদের অধিকাংশ নিকটাত্মীয় এই পোর্ট এন্ট্রির মাধ্যমে অস্ট্রিয়ায় আসেন।

অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বড় জোয়ারটি আসে ১৯৯০ এর দশকের প্রথম দিকে। এই সময় অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে প্রচুর স্টুডেন্ট ভিসায় অস্ট্রিয়া আসেন। সে সময়ে বাংলাদেশ থেকে এইচ এস সি (HSC) পাশ করা সার্টিফিকেট থাকলেই অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেত। অস্ট্রিয়ায় সে সময়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া বলতে গেলে ফ্রিই ছিল। সে সময় শুধুমাত্র প্রতি সেমিস্টারে নামমাত্র রেজিস্ট্রেশন ফি দিলেই চলতো।

বাংলাদেশে অস্ট্রিয়ার কোন দূতাবাস নাই। ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে অবস্থিত অস্ট্রিয়ান দূতাবাস একই সাথে ভারত,বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কাজ করে থাকেন। সে সময় বাংলাদেশের কাশেম গ্রুপ বাংলাদেশে অস্ট্রিয়ান দূতাবাসের কাজ করতেন।

তাছাড়াও ৮০ ও ৯০ এর দশকে অনেক বাংলাদেশী পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ থেকেও অবৈধ অনুপ্রবেশ করে অস্ট্রিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে ছিলেন। সে সময় অস্ট্রিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীন শরীকদল গ্রিণ পার্টি (Grüne) এই দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের অস্ট্রিয়ায় বসবাস করার জন্য এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ফ্রি আইনগত সহায়তা দিতেন। ফলে সে সময়ে বাংলাদেশীরা অতি সহজেই অস্ট্রিয়ায় থাকার সুযোগ পেয়ে যেতেন। অবশ্য এখন গ্রিণ পার্টি আর এই সহায়তা দেন না এবং অস্ট্রিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের জন্য আইন অনেক কঠিন ও কঠোর।

আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগের পূর্বে অস্ট্রিয়ায় বিশেষ করে রাজধানী ভিয়েনায় প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হত। অস্ট্রিয়া ১৯৭০ দশকে মিশরের সাথে পত্রিকার হকারের জন্য একটি চুক্তি করে। ফলে সে সময় মিশর থেকে প্রচুর লোকজন এসে অস্ট্রিয়ায় পত্রিকা বিক্রির কাজ করতো। বাংলাদেশ থেকে আগত ছাত্র বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকাংশই পরবর্তীতে এই পত্রিকা বিক্রয়ের কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। অস্ট্রিয়া পর্যটন সমৃদ্ধ দেশ বলে এই দেশে রেস্টুরেন্ট ও ফাস্ট ফুড ব্যবসা বেশ জমজমাট ব্যবসা বলে অনেক বাংলাদেশী এই গ্যাস্ট্রোনমিক কাজেও যুক্ত হয়ে পড়েন এবং এখনও আছেন।

৮০ ও ৯০ এর দশকে যে সকল বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন তাদের প্রায় সবাই এখন অস্ট্রিয়ান নাগরিকত্ব নিয়ে নিয়েছেন। সে সময় অস্ট্রিয়ার নিয়মে ১০ বছর বৈধ ভিসা নিয়ে বিদেশী কেহ যদি এই দেশে কোন ফৌজদারি মামলা ছাড়া এবং নিয়মিত আয়কর পরিশোধ করার সাপেক্ষে নাগরিকত্বের আবেদন করে সহজেই অস্ট্রিয়ান নাগরিক হয়েছেন। অস্ট্রিয়ার রাস্ট্রীয় ভাষা জার্মান এবং অস্ট্রিয়ার লেখা-পড়া জার্মান ভাষাতেই হয়। তাই এই দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কোর্সের পূর্বে জার্মান ভাষা শিক্ষা অত্যাবর্শক। বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হাতে-গোনা দুই এক ছাড়া কেহই আর পড়ালেখা করেন নি। তবে দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তানেরা বর্তমানে অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে এবং অনেকেই সাফল্যের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে ভালো কর্মক্ষেত্রেও যোগদান করেছেন।

ইতিমধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তান মাহমুদুর রহমান নয়ন (সফট ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার) অষ্ট্রিয়ার মুল ধারার রাজনীতিতে সংযুক্ত হয়ে ক্ষমতাসীন দল অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টি (ÖVP) থেকে ভিয়েনার ২৩ নং ডিসট্রিক্ট থেকে সিটি কাউন্সিলর হয়ে সুনামের সহিত কাজ করে যাচ্ছেন ।

বর্তমানে বিদেশীদের এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জন্য অস্ট্রিয়ার নিয়ম কানুন অনেক কঠিন ও কঠোর করা হয়েছে। অস্ট্রিয়া ১৯৯৩ সালের পর থেকেই বিদেশীদের জন্য তার ভিসা স্ট্যাটাস পরিবর্তন নিষিদ্ধ করেছে।বর্তমানে অস্ট্রিয়া স্টুডেন্ট ভিসাও অনেক কঠিন করা হয়েছে এবং কিছু অতিরিক্ত ফিও যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অস্ট্রিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক এক বছরের জেল এবং তারপর যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

৮০ ও ৯০ এর দশকের পর অনেক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতরা অর্থের বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট ম্যারিজ বা পালক বাবা-মা বানিয়েও কাগজ বানিয়েছেন।অনেকে আবার রোহিঙ্গা মামলা দিয়েও বৈধতা পেয়েছেন। তবে বর্তমানে এই সমস্ত কার্যকলাপ সব বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ অস্ট্রিয়ান কর্তৃপক্ষ এই সমস্ত কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল আছেন।তারাও এখন জানেন, আমাদের রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আসল সমস্যা অর্থনৈতিক এবং উন্নত বিশ্বে বসবাসের উচ্চাকাংখা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, এখনও অনেকেই জানতে চাইছেন, অস্ট্রিয়া কিভাবে আসা যায়, স্টুডেন্ট ভিসা কি পাওয়া যায়, অস্ট্রিয়া আসতে কত টাকা লাগতে পারে ইত্যাদি। তাছাড়াও বাংলাদেশে কাগজের ভেরিফিকেশন, পাসপোর্ট , ভিসা প্রসেস করতে কত লাগবে ? আসলে এইসব যার যার  উপরে নির্ভর করছে। এর বাইরে ছাত্র হিসেবে এলে প্রথম এক বছরের জন্য প্রায় ১০ হাজার ইউরো দেখাতে হবে। বাংলাদেশী ছাত্রদের জন্য এখনো কোন বেতন নাই। কিন্তু থাকা খাওয়ার খরচ সাথে আনতে হবে। এর বাইরে যারা জব ভিসার কথা ভাবছেন, সেই জব আপনার বাংলাদেশ থেকেই যোগাড় করতে হবে। টুরিস্ট ভিসাতে এসে থাকার এপ্লাই করা যায় না। কোন মতে এসে এসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) নেবেন, এমন স্বপ্ন ভুলে যান। আগে যা হয়েছে, তা হয়ে গেছে।

২০১৫ এবং ২০১৬ সালে এত বেশি বাংলাদেশী রিফিউজি ইউরোপে এসেছে যে সব দেশের সরকার বাংলাদেশীদের উপরে চরম বিরক্ত। বাংলাদেশ সরকার এদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে না বলে ইউরোপ বাংলাদেশীদের ভিসা বন্ধ করে দেওয়ার কথা বার্তা বলছে। এর ফলে যেইটা হয়েছে, বন্ধ না হলেও ভিসার পুরো প্রসেস ভয়ানক কঠিন করে ফেলা হয়েছে।

সুতরাং, কোন এজেন্সির লোভনীয় বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ বা মুখরোচক কথায় ভুলবেন না। কাউকে টাকা দেওয়ার আগে অবশ্যই সঠিক তথ্য যাচাই করে নিবেন। বেশ কিছুদিন ধরে এরা ছাত্রদের ভিসা আটকে রেখেছে। শুধু ফ্যামিলি ভিসা দিচ্ছে। আরেকটা কথা, যারা জব ভিসার স্বপ্ন দেখছেন, জার্মান ভাষা জানা না থাকলে বেশির ভাগ কাজই পাবেন না।  এখন রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া, কাগজ বিলানো কিংবা রেস্টুরেন্টে  থালা বাসন ধোয়ার কাজও পাওয়া যায় না। যে সব রিফিউজি এবং পূর্ব ইউরোপের গরীব লোক আছে, তারা ১ বা ২ ইউরোতে এসব কাজ নিয়ে নেয়। তাই ধার কর্জ করে এসে কুলাতে পারবেন না। একমাত্র IT সেক্টরে  উচ্চ শিক্ষিত এবং দক্ষ লোকের চাকুরি আছে। আর পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। Job on demand list দেখুন এবং বুঝুন আপনার শিক্ষা বা দক্ষতা এই লিস্টে আছে কি না।

কবির আহমেদ, লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »