ইসলামের প্রথম কিবলা মসজিদুল আল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

অধিকাংশ মুসলমান গোল্ডেন টেম্পল বা টেম্পল মাউন্টকেই আল আকসা মসজিদ মনে করে থাকে

ডেস্কঃ আল-আকসা মসজিদ,আরবি: ٱلْـمَـسْـجِـد الْاَقْـصَى‎, মসজিদুল আল আকসা যা ইসলামে বাইতুল মুকাদ্দাস নামেও পরিচিত। আল আকসা মসজিদ জেরুজালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ।

এটির সাথে একই প্রাঙ্গণে কুব্বাত আস সাখরা, কুব্বাত আস সিলসিলা ও কুব্বাত আন নবী নামক স্থাপনাগুলো অবস্থিত। স্থাপনাগুলো সহ এই পুরো স্থানটিকে হারাম আল শরিফ বলা হয়। এছাড়াও স্থানটি “টেম্পল মাউন্ট” বলেও পরিচত এবং ইহুদি ধর্মের পবিত্র স্থান বলেও বিবেচিত হয়। আমরা অনেকেই ইহুদীদের এই গোল্ডেন টেম্পল বা টেম্পল মাউন্টকেই আল আকসা মসজিদ বা বাইতুল মুকাদ্দাস ভেবে ভুল করে থাকি।

ইসলাম ধর্মের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম (কাবা) থেকে আল-আকসা মসজিদে এসেছিলেন এবং এখান থেকে তিনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে যাত্রা করেন।

ইতিহাসবিদ পণ্ডিত ইবনে তাহমিয়ার মতে, আসলে আল্লাহর নবী হযরত সুলায়মান (আঃ) এর তৈরি সম্পূর্ণ উপাসনার স্থানটির নামই হল মসজিদুল আল-আকসা।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে আল আকসা মসজিদকে সামনে রেখে রাসূল মুহাম্মদ সাঃ এবং সাহাবী রাঃ গণ নামাজ পড়া শুরু করেন। পরবর্তীতে মহান আল্লাহ নামাজের কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে পরিবর্তন করে মক্কার কাবা ঘর করেন। আর এর জন্যই আল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাসকে ইসলামের প্রথম কিবলাও বলা হয়ে থাকে।

মুহাদ্দিসগণ (হাদিস বিষয়ে পণ্ডিত) এই বিষয়ে একমত যে সম্পূর্ণ উপাসনার স্থানটিই ইসলামের নবী সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) তৈরি করেছিলেন যা পরবর্তীতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা বিশ্বাস করে, নির্মাণের পর থেকে এটি ঈসা (আঃ)  সহ অনেক নবীর দ্বারা এক আল্লাহকে উপাসনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এই স্থান মুসলিমদের প্রথম কিবলা (প্রার্থনার দিক)। হিজরতের পর কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণে কাবা নতুন কিবলা হয়।  বর্তমানে “আল-আকসা” মসজিদ বলতে বোঝাায় কিবলি মসজিদ, মারওয়ানি মসজিদ ও বুরাক মসজিদ (৩টির) এর সমন্বয় যা “হারাম আল শরীফ” এর চার দেয়াল এর মধ্যেই অবস্থিত।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাঃ) বর্তমান মসজিদের স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের যুগে মসজিদটি পুনর্নির্মিত ও সম্প্রসারিত হয়। এই সংস্কার ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তার পুত্র খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের শাসনামলে শেষ হয়। ৭৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর এটি পুনর্নির্মাণ করেন। পরে তার উত্তরসুরি আল মাহদি এর পুনর্নির্মাণ করেন। ১০৩৩ খ্রিষ্টাব্দে আরেকটি ভূমিকম্পে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফাতেমীয় খলিফা আলি আজ-জাহির পুনরায় মসজিদটি নির্মাণ করেন যা বর্তমান অবধি টিকে রয়েছে।

বিভিন্ন শাসকের সময় মসজিদটিতে অতিরিক্ত অংশ যোগ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে গম্বুজ, আঙ্গিনা, মিম্বর, মিহরাব, অভ্যন্তরীণ কাঠামো। ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করার পর তারা মসজিদটিকে একটি প্রাসাদ এবং একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত কুব্বাত আস সাখরাকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করত। সুলতান সালাহউদ্দিন জেরুজালেম পুনরায় জয় করার পর মসজিদ হিসেবে এর ব্যবহার পুনরায় শুরু হয়। আইয়ুবী, মামলুক, উসমানীয়, সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল ও জর্ডানের তত্ত্বাবধানে এর নানাবিধ সংস্কার করা হয়। বর্তমানে পুরনো শহর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তবে মসজিদটি জর্ডা‌নি/ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন ইসলামি ওয়াকফের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

ইসলামের নবী হযরত ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) (খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের ধর্মাম্ভাবলীদের আব্রাহাম) জেরুসালেমেও একটি উপাসনার স্থান প্রতিষ্ঠা করছিলেন। কাবা নির্মাণের চল্লিশ বছর পর (খ্রিষ্টপূর্ব ২১৭০) তিনি এটিকে আরও সম্প্রসারণ করেন যা পরবর্তীতে “বাইতুল মুকাদ্দাস” নামে পরিচিত হয়। মসজিদে হারামের তুলনায় দূরতম উপাসনার স্থান হওয়ায়, ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এটিকে “মাসজিদুল আকসা’ বলেও উল্লেখ করতেন। তাঁর পুত্র

নবী হযরত ইসহাক (আলাইহিস সালাম)ও এখানে ইবাদত করতেন তবে তিনিও তার পিতার মত কাবাতে হজ্জ করতে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইসহাক (আলাইহিস সালাম) এর দ্বিতীয় পুত্র আল্লাহর নবী হযরত ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) এই অঞ্চলের এক আল্লাহতে বিশ্বাসীদের জন্য উপাসনার স্থান হিসাবে এটিকে বর্ধিত করেছিলেন।

পরবর্তিতে বনি ইসরাইলের নবী ও বাদশা হযরত দাউদ আঃ এর পুত্র নবী হযরত সুলায়মান আঃ এই উপাসনার স্থানটির স্থাপত্য (সেকেন্ড টেম্পল) তৈরি ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন (খ্রিষ্টপূর্ব ১০০৪) । মুসলমানরা বিশ্বাস করে এই কাজে তিনি  জ্বীনদেরকে নিয়োগ করেছিলেন। এবং আল্লাহতায়ালা “গলিত তামার ঝরণা” প্রবাহিত করেছিলেন। এরপর ব্যবিলনের সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচ্যাডনেজার; হযরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) এর তৈরি স্থাপত্যগুলি ধ্বংস করেন (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬)।

এই স্থান রাজা হেরোড দ্য গ্রেটের সময় (২০৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে) সম্প্রসারিত হয়। মসজিদটি একটি প্লাটফর্মের উপর অবস্থিত যা হেরোডের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন স্থানগত অবস্থা কাটিয়ে উঠার জন্য নির্মাণ করেছিলেন। সেকেন্ড টেম্পলের সময় বর্তমান মসজিদের স্থানটিতে রয়েল স্টোয়া ( প্রশাসনিক ভবন) ছিল। এরপর ৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানরা এটিকে ধ্বংস করে (পুড়িয়েও ফেলেছিল), দেবতা জুপিটারের উপাসনার স্থানে পরিণত করেছিল। ৩১৫ খ্রিষ্টাব্দে  খ্রিষ্টানে রূপান্তরিত রোমান সম্রাজ্য এটিকে ময়লা ফেলার স্থানে পরিণত করে এবং এসময় ইহুদীরাও এটিকে তাদের পবিত্র স্থান বলে মনে করত না।

একসময় ধারণা করা হত যে সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সময় নির্মিত নিয়া চার্চ বর্তমান মসজিদুল আকসার স্থানে অবস্থিত ছিল। তবে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ইহুদি মহল্লার দক্ষিণ অংশে এর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। ১৯৩০ এর দশকে সংস্কারের সময় সরিয়ে নেয়া কাঠের বীম ও প্যানেল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এগুলো লেবাননের সিডার এবং সাইপ্রেস দ্বারা নির্মিত ছিল। রেডিওকার্ব‌ন ডেটিং পরীক্ষায় এর কিছু ৯ম শতাব্দীর বলে জানা গেছে।

বর্তমান স্থাপনাটি উমাইয়া যুগের। দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ প্রথম এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। কয়েকজন মুসলিম পণ্ডিত যেমন মুজিরউদ্দিন আল-উলাইমি, জালালউদ্দিন সুয়ুতি ও শামসউদ্দিন আল-মুকাদ্দাসি বলেন যে খলিফা আবদুল মালিক ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করেন। সে সাথে তিনি কুব্বাত আস সাখরা নির্মাণ করেন। আবদুল মালিক মসজিদের কেন্দ্রীয় অক্ষ প্রায় ৪০ মিটার (১৩০ ফু) পশ্চিমে সরিয়ে আনেন যা হারাম আল শরিফ নিয়ে তার সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ ছিল। পুরনো অক্ষ একটি মিহরাব দ্বারা চিহ্নিত করা হয় যা “উমরের মিহরাব” বলে পরিচিত। কুব্বাত আস সাখরার উপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুল মালিক তার স্থপতিদের দ্বারা নতুন মসজিদকে সাখরার সাথে এক সারিতে আনেন।

অন্যদিকে ক্রিসওয়েলের মতে আবদুল মালিকের ছেলে প্রথম আল ওয়ালিদ মসজিদ পুনর্নির্মাণ করেন এবং দামেস্কের কর্মরা এতে কাজ করে। অধিকাংশ পণ্ডিতদের একমত যে মসজিদের পুনর্নির্মাণ আবদুল মালিকের সময় শুরু হয় এবং আল ওয়ালিদের সময় তা শেষ হয়। ৭১৩-১৪ খ্রিষ্টাব্দে কয়েকটি ভূমিকম্পে জেরুজালেমের ক্ষতি হয় এবং মসজিদের পূর্ব অংশ ধ্বংস হয়। এ কারণে আল-ওয়ালিদের শাসনামলে পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

৭৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ভূমিকম্পে মসজিদুল আকসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর চার বছর পর আস-সাফাহ উমাইয়াদের উৎখাত করে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর ৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদ পুনর্নির্মাণের জন্য তার সংকল্প ব্যক্ত করেন এবং ৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে তা সমাপ্ত হয়। ৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় একটি ভূমিকম্পের ফলে আল মনসুরের সংস্কারের সময়ের দক্ষিণ অংশ বাদে অনেক অংশ ধ্বংস হয়। ৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে তার উত্তরসুরি খলিফা আল-মাহদি এর পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি দৈর্ঘ্য কমিয়ে প্রস্থ বৃদ্ধি করেন।আল-মাহদির সংস্কার এ বিষয়ে প্রথম লিখিত বিবরণ বলে জানা যায় যা কাজের বর্ণনা প্রদান করে। ৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেমে জন্ম নেয়া আরব ভূগোলবিদ শামসউদ্দিন আল-মুকাদ্দাসি লিখেছেন যে এসময় মসজিদে পনেরটি দরজা ও মুসল্লিদের ধারণের জন্য উত্তর দক্ষিণ বরাবর পনেরটি  সারি ছিল।

১০৩৩ খ্রিষ্টাব্দে আরেকটি ভূমিকম্প হয় ফলে মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফাতেমীয় খলিফা আলি আজ-জাহির ১০৩৪ থেকে ১০৩৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করেন। এসময় মুসল্লিদের ধারণের জন্য পনেরটি মূল সারির সংখ্যা কমিয়ে সাতটি করা হয়।আজ-জাহির কেন্দ্রীয় কক্ষের চারটি তোরণ এবং করিডোর নির্মাণ করেন যা বর্তমানে মসজিদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। পারস্যের ভূগোলবিদ নাসির খসরু ১০৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তার ভ্রমণের সময় মসজিদুল আকসার বর্ণনা দিয়েছেন।

“হারাম এলাকা জেরুজালেমের পূর্ব অংশে অবস্থিত; এবং (এই মহল্লার) বাজারের মধ্যে দিয়ে গিয়ে একটি বৃহৎ ও সুন্দর ফটক দিয়ে এই এলাকায় প্রবেশ করা যায় এবং এই ফটক পার হওয়ার পর  দুটি বৃহৎ স্তম্ভের সারির (রিওয়াক) ডানে দেখা যায় যেগুলোর প্রত্যেকটিতে নয় ও বিশটি মার্বেল স্তম্ভ আছে, যেগুলোর শীর্ষ ও ভিত্তি রঙ্গিন মার্বেলের, এবং সংযুক্তিগুলো সীসার। স্তম্ভের শীর্ষে আর্চ উত্থিত যা চুন বা সিমেন্ট ছাড়া পাথরে নির্মিত, এবং প্রতিটি আর্চ পাঁচ বা ছয়টির বেশি পাথরের ব্লক দ্বারা তৈরী নয়। এই স্তম্ভসারিগুলো মাকসুরাহ নিয়ে যায়”।

১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের সময় ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে নেয়। তারা মসজিদকে “সলোমনের মন্দির” এবং কুব্বাত আস সাখরাকে টেমপ্লাম ডোমিনি (ঈশ্বরের গম্বুজ) নাম দেয়। কুব্বাত আস সাখরা এসময় অগাস্টিনিয়ানদের তত্ত্বাবধানে গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়, আল-আকসা মসজিদকে রাজপ্রাসাদ ও পাশাপাশি ঘোড়ার আস্তাবল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১১১৯ খ্রিষ্টাব্দে একে নাইটস টেম্পলারদের সদরদপ্তর করা হয়। এ সময় মসজিদে কিছু অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে ছিল উত্তরের বারান্দা সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত এপস যোগ এবং একটি বিভক্তকারী দেয়াল নির্মাণ। কিছু স্থাপনার পাশাপাশি একটি নতুন মঠ ও গির্জা নির্মিত হয়। টেম্পলাররা দালানের পশ্চিম ও পূর্বে খিলানযুক্ত বর্ধি‌তাংশ নির্মাণ করে যার মধ্যে পশ্চিমেরটি বর্তমানে মহিলাদের নামাজের জায়গা এবং পূর্বেরটি ইসলামি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে আইয়ুবীয়রা জেরুজালেম জয় করার পর মসজিদুল আকসায় কয়েকটি সংস্কার সাধিত হয়। জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদকে প্রস্তুতের নিমিত্তে জেরুজালেম জয়ের এক সপ্তাহের মধে ক্রুসেডারদের স্থাপন করা টয়লেট ও শস্যের গুদাম সরিয়ে ফেলা হয়। মেঝে দামি কার্পেটে আচ্ছাদিত করা হয় এবং ভেতরের অংশ গোলাপজল এবং সুগণ্ধি দিয়ে সুগণ্ধযুক্ত করা হয়।।সালাহউদ্দিনের পূর্বসূরি জেনগি সুলতান নুরউদ্দিন জেনগি ১১৬৮-৬৯ খ্রিষ্টাব্দে হাতির দাঁত ও কাঠ দিয়ে একটি মিম্বর নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন যা তার মৃত্যুর পর নির্মাণ সমাপ্ত হয়। নুরউদ্দিনের মিম্বরটি সালাহউদ্দিন মসজিদে স্থাপন করেন। দামেস্কের আইয়ুবী সুলতান আল-মুয়াজ্জাম ১২১৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনটি ফটকসহ উত্তরের বারান্দা নির্মাণ করেন। ১৩৪৫ খ্রিষ্টাব্দে আল-কামিল শামানের অধীনে মামলুকরা পূর্ব দিকে আরো দুটি সারি ও ফটক যুক্ত করে।

উসমানীয়রা ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতা নেয়ার পর মসজিদের কোনো বড় পরিবর্তন করেনি কিন্তু পুরো হারাম আল শরিফে সামগ্রিকভাবে পরিবর্তন আনা হয়। এসময় কাসিম পাশার ফোয়ারা (১৫২৭) নির্মিত হয়, রারাঞ্জ সেতু সংস্কার এবং তিনটি মুক্ত গম্বুজ নির্মিত হয়। এসকল স্থাপনা জেরুজালেম গভর্নরগণ নির্মাণ করিয়েছিলেন। সুলতানগণ মিনারের সম্প্রসারণ করেন।।১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে গভর্নর সুলাইমান পাশা আল-আদিল জীর্ণ অবস্থার কারণে মসজিদ সংস্কার করেন।

১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বিশ শতকের প্রথম সংস্কার সাধিত হয়। এসময় জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ আমিন আল-হুসাইনির অধীন সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল তুর্কি স্থপতি মিমার কামালউদ্দিন বেকে মসজিদুল আকসা ও এর পরিপার্শ্বের স্থাপনাগুলো সংস্কারের জন্য দায়িত্ব দেয়। এছাড়াও কাউন্সিল ব্রিটিশ স্থপতি, মিশরীয় প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের সংস্কারে অবদান ও তদারকির দায়িত্ব দিয়েছিল। এই সংস্কারের মধ্যে ছিল মসজিদের প্রাচীন উমাইয়া ভিত্তি মজবুত করা, ভেতরের কলাম মজবুত করা, নতুন বীম যুক্তকরণ, একটি মঞ্চ নির্মাণ, আর্চ এবং মূল গম্বুজের ভেতরের অংশ সংরক্ষণ, দক্ষিণ দেয়াল পুনর্নির্মাণ এবং কেন্দ্রীয় সারির কাঠগুলো কংক্রিটের স্ল্যাব দ্বারা প্রতিস্থাপন। এসময় প্লাস্টারে ঢাকা পড়ে যাওয়া ফাতেমীয় আমলের মোজাইক ও খোদিত লিপি ফিরিয়ে আনা হয়। আর্চগুলো স্বর্ণ এবং সবুজ ছোপযুক্ত জিপসাম দ্বারা সৌন্দর্যমন্ডিত করা হয় এবং কাঠের বীমগুলো পিতল দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়। কিছু স্টেইন্ড গ্লাসের জানালা তাদের আব্বাসীয় ও ফাতেমীয় নকশা অপরিবর্তিত রেখে নতুন করা হয়।  ১৯২৭ ও ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ভূমিকম্পে মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তবে ১৯৩৮ ও ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে তা সারিয়ে তোলা হয়।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ আগস্ট অস্ট্রেলীয় পর্যটক ডেনিস মাইকেল রোহান কর্তৃক মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রোহান ওয়ার্ল্ডওয়াইড চার্চ অফ গড নামক এভাঞ্জেলিকাল খ্রিষ্টান গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন। তার ধারণা ছিল যে মসজিদুল আকসা পুড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে তিনি যীশুর দ্বিতীয় আগমনকে ত্বরান্বিত করতে পারবেন এবং ইহুদি মন্দির তৈরীর পথ করতে পারবেন। রোহানকে এরপর একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।  এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সেই বছর মরোক্কর রাবাতে মুসলিম দেশগুলোর এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ এর উদ্যোক্তা ছিলেন। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ওআইসি গঠনের ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে।

মসজিদটি হারাম আস-শরিফের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত মসজিদটি হারাম আস-শরিফের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ১৯৮০ এর দশকে গুশ এমুনিম আন্ডারগ্রাউন্ড নামক সংগঠনের সদস্য বেন শোশান ও ইয়েহুদা এতজায়ন আল-আকসা মসজিদ ও কুব্বাত আস সাখরা উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন। এতজায়ন বিশ্বাস করতেন যে স্থাপনা দুটি উড়িয়ে দিলে তা ইসরায়েলের আধ্যাত্বিক জাগরনে ভূমিকা রাখবে এবং ইহুদি জনগণের সকল সমস্যা সমাধান করবে। তারা এও ধারণা করতেন যে তৃতীয় মন্দির মসজিদের স্থানে নির্মিত হতে হবে। প্রথম ইন্তিফাদা চলার সময় ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি ইসরায়েলি সেনারা মসজিদের বাইরে বিক্ষোভকারীদের উপর রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং এতে ৪০ জন মুসল্লি আহত হয়।

১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ অক্টোবর দাঙ্গায় ইসরায়েলি সীমান্ত পুলিশ কর্তৃক ২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ১০০ জনের বেশি আহত হয়। টেম্পল মাউন্ট ফেইথফুল নামক ইহুদি ধর্মীয় গোষ্ঠী তৃতীয় মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করতে যাচ্ছে ঘোষণা করলে এই প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল।

২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এরিয়েল শ্যারন এবং লিকুদ পার্টির সদসরা ১০০০ সশস্ত্র রক্ষীসহ আল-আকসা চত্বর পরিদর্শন করেন। ব্যাপক সংখ্যক ফিলিস্তিনি এর প্রতিবাদ করে। শ্যারন ও লিকুদ পার্টির সদস্যরা স্থানত্যাগ করার পর হারাম আল শরিফের প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি দাঙ্গা পুলিশের উপর পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে বিক্ষোভ শুরু হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার ছুড়লে ২৪ জন আহত হয়। এই পরিদর্শনের ফলে পাঁচ বছরব্যপী আন্দোলন চলে সাধারণভাবে আল-আকসা ইন্তিফাদা নামে পরিচিত। তবে কিছু ধারাভাষ্যকার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা, যেমন ইমাদ ফালুজি ও আরাফাতের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন যে ইন্তিফাদা কয়েক মাস আগে ইয়াসির আরাফাতের ক্যাম্প ডেভিড আলোচনা থেকে ফেরার পর থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি সরকার মসজিদে ২,০০০ হাজার দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করে। জুম্মার নামাজের পর একদল ফিলিস্তিনি মসজিদ ত্যাগ করার পর তারা পুলিশের উপর পাথর নিক্ষেপ করে। পুলিশ এরপর মসজিদ চত্বরে প্রবেশ করে গুলি ও রাবার বুলেট ছোড়া শুরু করে ফলে চারজন নিহত ও প্রায় ২০০ জন আহত হয়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ নভেম্বর ইসরায়েলি পুলিশ ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম দখল করার পর প্রথমবার আল-আকসায় প্রবেশ করে বলে ইসলামিক ওয়াকফের পরিচালক শাইখ আজ্জাম আল-খতিব উল্লেখ করেছেন। পূর্ববর্তী মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয় এ পুলিশ হারাম আল শরিফ চত্বরে প্রবেশ করেছে, মসজিদে নয়।

বর্তমান এই আল আকসাকে কেন্দ্র করে পুনরায়  উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীন এই এলাকায় যখনই ইহুদীরা এই মসজিদ ধ্বংস বা মুসলমানদের এখান থেকে উচ্ছেদের পরিকল্পনা করেন,আর তখনই স্থানীয় আরব মুসলিমরা প্রবল প্রতিবাদে ফেটে পড়েন এবং ইসরাইলের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

কবির আহমেদ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »