রমজান মাসের রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

কবির আহমেদঃ রোযা বা রোজা একটি ইরানের ফার্সি শব্দ। মূলত রোজা শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘বিরত থাকা’। আর আরবিতে এর নাম সাওম, বহুবচনে সিয়াম। যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। ইসলাম ধর্মের মূল পাঁচটি ভিত্তির তৃতীয় টি হল এই রোজা। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মেই রোজার রাখার প্রচলন আছে তবে একেক ধর্মে রোজার রাখার ধরণ ও নিয়ম একেক রকমের হয়ে থাকে।

ইসলাম ধর্মের বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ যার অর্থ অবশ্য পালনীয়। ইসলাম ধর্মে রোজা বলতে সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, কামাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকাকে বুঝায়। ইসলামের

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রোজা ফরজ হয় দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে।

মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পবিত্র আল কোরআনে রমজান মাসের রোজা সম্পর্কে বলেন,”হে ঈমানদারগন ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা

হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাক্ওয়া (পরহেজগারী) অর্জন করতে পার।”

[সূরা আল-বাকারা, আয়াতঃ ১৮৩] এই আয়াত থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে,রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য, গুনাহ বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জান্নাতের উপযোগী হওয়া, নিজেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। রমজানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহ্ তাআলা এ মাসটিকে স্বীয় ওহি সহিফা ও আসমানি কিতাব নাজিল করার জন্য মনোনীত করেছেন। অধিকাংশ ঐশী গ্রন্থ বা আসমানী কিতাবএই রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে বলে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর মুখ নিসৃত বাণী বা হাদিস থেকে জানা যায়।

 

হাদিসে বর্ণিত, হজরত ইব্রাহিম (আ.)–এর সহিফা রমজানের ১ তারিখে, তাওরাত রমজানের ৬ তারিখে, যাবুর রমজানের ১২ তারিখে, ইঞ্জিল রমজানের ১৮ তারিখে এবং পবিত্র কোরআন কদরের রাত্রিতে নাজিল হয়েছে। আল্লাহ এই  রমজান মাসের যে রাতে পবিত্র আল কোরআন  অবতীর্ণের সূচনা করেছেন,সেই রাতকে আল্লাহ বৎসরের শ্রেষ্ঠ রাত এবং এই রাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন কোরআনে।

রমজান মাসের রোজা পালনকে ফরজ আখ্যায়িত করে আল্লাহ্ তাআলা সুরা আল বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন,”রমজান মাস যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে আর এ কোরআন মানবজাতির জন্য পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন, হক বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে সে এতে রোজা রাখবে, যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, সে পরবর্তী সময়ে গু​নে গুনে সেই পরিমাণ দিন পূরণ করে দেবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য কঠিন করতে চান না, যাতে তোমরা গণনা পূরণ করো এবং তোমাদের হিদায়াত দান করার দরুন আল্লাহর মহত্ত্ব বর্ণনার পর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।”

বুখারি শরিফে বর্ণিত হাদিসে হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, হজরত মুহাম্মদ (স.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীতের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন রাসুলে পাক (সা.) ইরশাদ করেন,

“সিয়াম এবং কোরআন হাশরের ময়দানে বান্দা–বান্দীর জন্য সুপারিশ করবে এবং আল্লাহ্ তাআলা তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করবেন।”

হজরত আবু হোরায়রা (রা.) আরও বর্ণনা করেন রাসুলে পাক (সা.) বর্ণনা করেন, প্রত্যেক বস্তুর জাকাত রয়েছে, তেমনি শরীরেরও জাকাত আছে, আর শরীরের জাকাত হচ্ছে রোজা পালন করা। অর্থাৎ জাকাতদানে যেভাবে মালের পবিত্রতা অর্জন হয়, তেমনি রোজা পালনের মাধ্যমে শরীর পবিত্র হয়, গুনাহ মুক্ত হয়।

হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসুলে পাক (স.) ইরশাদ করেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের সওয়াব দশ গুণ হতে সাত শত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ্ তাআলা বলেন, ‘রোজা এ নিয়মের ব্যতিক্রম, কেননা তা বিশেষভাবে আমার জন্য আমি স্বয়ং তার প্রতিদান দেব, বান্দা তার পানাহার ও কামনা–বাসনাকে আমার সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করেছে।’

রোজা রেখে সর্ব প্রকার গুনাহ বর্জনের অঙ্গীকার করতে হবে রোজার মাসে শুরুতে আল্লাহ্ তাআলা জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন, জান্নাতের দরজা খুলে দেন এবং শয়তানকে শিকলবদ্ধ করে রাখেন। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। নেক কাজে অগ্রগামী হতে পারে। আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কালামের অনেক জায়গায় শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, শয়তান তোমাদের শত্রু, তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো। সে চায় মানুষের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি করা, মদ–জুয়ায় নিমগ্ন করা, মিথ্যা বলায় উদ্বুদ্ধ করা, এককথায় খারাপ কাজে জড়িয়ে দেওয়া। তাই হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও তৎসংক্রান্ত কাজ পরিত্যাগ করল না, তার রোজা রাখার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তাই শয়তানি কার্যক্রম থেকে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।

 

রোজাদারের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা:

হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) ইরশাদ করেন, জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে একটি দরজার নাম ‘রাইয়ান’। এ দরজা দিয়ে শুধু রোজাদারগণ প্রবেশ করবে। অন্যরাও এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে চাইবে। কিন্তু রোজাদার ব্যতীত অন্য কাউকে এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। (বুখারি ও মুসলিম)।

রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ:

হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল পাক (সা.) ইরশাদ করেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে, একটি তার ইফতারের সময়, অপরটি হলো আল্লাহ্ তাআলার দিদার বা সাক্ষাতের সময়। হাদিসে আরও উল্লেখ রয়েছে, ইফতারের সময় দোয়া কবুলের সময়। আল্লাহ্ তায়ালা বান্দার দোয়া কবুল করেন। আর এই সময়ের দোয়া হচ্ছে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিরাহমাতিকাল্লাতি ওয়াসিয়াত কুল্লা শাইয়িন আন তাগফিরা লি জুনুবি।’

লাইলাতুল কদর:

লাইলাতুল কদর হচ্ছে এমন একটি রাত যে রাতে আল্লাহ মানুষের জীবন পরিচালনার দিক নির্দেশনা সম্বলিত ঐশী গ্রন্থ আল কোরআনের অবতীর্ণেরসূচনা করেছেন। তাই কোরআন অবতীর্ণের এই মহিমান্বিত এক রাতের ইবাদতকে আল্লাহ হাজার মাসের ইবাদত অর্থাৎ প্রায় ৮৩ বৎসরের ইবাদতের সমান বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এই রাতের গুরুত্ব বুঝাতে আল্লাহ সূরা আল কদর নামে একটি স্বতন্ত্র সূরাও নাজিল করেছেন।

কোরআন ও হাদিসের বক্তব্য অনুযায়ী যে ব্যক্তি কদরের রাতে সওয়ারের আশায় ইবাদত করবে, তার অতীতের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। তাই এই লাইলাতুল কদরের রাতকে ইসলামে মানুষের ভাগ্য রজনী বলেও অভিহিত করা হয়।

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) আমি যদি কদরের রাত্রি পাই, তাহলে আমি কী দোয়া পড়ব? ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি’ এই দোয়া পড়বে। হাদিসে আছে, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখ) শবে কদর তালাশ করবে।

তারাবি নামাজ:

এশার সালাতের (ফরজ ও সুন্নতের) পর বিতরের আগে দুই রাকাত করে মোট ৮,১২,২০ ইত্যাদি রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নত। এই মাসে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই তারাবি নামাজে কোরআন খতম দেওয়া হয়। এটা কোন ফরজ নামাজ নয়,তাই কেহ কম বেশী পড়লে কোন সমস্যা নাই। হাদিস থেকে জানা যায় রাসূল সাঃ সাধারণত দুই রাকায়াত করে ৮ রাকায়াত পড়তে বেশী পছন্দ করতেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাঃ এর আমল থেকে জামায়াতে তারাবী নামাজের প্রচলন শুরু হয়। কাজেই যার সময় আছে বেশী রাকায়াত নামাজ পড়বে,আর যার সময় কম তারা কমপক্ষে ৮ রাকায়াত পড়বে। এতে বিতর্ক বা বাধানুবাদের কোন অবকাশ নাই।ইসলামে বেশী ইবাদত করলে বেশী সওয়াব হবে এমন কথা কোথাও উল্লেখ নেই। তবে বলা হয়েছে,ইবাদত ছোট হলেও সেটা যেন সুন্দর এবং নিয়মিত হয়। রাসূল সাঃ সব সময় নফল নামাজ কম রাকায়াত পড়তেন কিন্ত এই অল্প নামাজ দীর্ঘ সময় ধরে কোরআন তেলাওয়াত করতেন।

রোজার শেষ দশ দিন মসজিদে অবস্থান করা:

আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ওয়া আনতুম আকিফুনা ফিল মাসজিদ’ তোমরা মসজিদে ইতিকাফ করো। ইতিকাফ শব্দের অর্থ নিজেকে আবদ্ধ রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ হলো, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় শর্ত সাপেক্ষে নিয়ত সহকারে পুরুষেরা মসজিদে ও নারীরা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা। রমজানের শেষ দশক (২০ রমজান থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা পর্যন্ত) ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। বিনা প্রয়োজনে অর্থাৎ গোসল, খাবার, প্রস্রাব–পায়খানা ব্যতীত অন্য কোনো অজুহাতে ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করতে পারবে না। ইতিকাফ অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, নফল নামাজ ইত্যাদিতে মশগুল থাকেন সকলে। ইতিকাফের আসল উদ্দেশ্য হল হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত”লাইলাতুল কদর” লাভ করা।

 কবির আহমেদ,উপ-সম্পাদকীয় /ইবি টাইমস  

 

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »