অভিশপ্ত ১৫ ই আগস্ট

অভিশপ্ত ১৫ ই আগস্ট  নিয়ে ড. মোঃ ফজলুর রহমানের ধারাবাহিক মতামত। এটি লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে ইউরোবাংলা টাইমসের সম্পাদকীয় নীতিমালার সম্পর্ক নেই

পর্ব-৩

ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ (২১) প্রসঙ্গক্রমে বলা আবশ্যক যে, বঙ্গবন্ধুর ৫৫ বছরের জীবনে তাঁকে মোট ১৮টি মামলায় আসামী করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের অন্যায়, অত্যাচার এবং অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে; রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সহ অধিকার হারা বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায় করতে গিয়ে এবং সর্বোপরি বাংলা মা কে স্বাধীন করতে গিয়ে তিনি সর্বমোট ১৪ বছর ৯ মাস অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ছাড়া এত দীর্ঘ সময় কারা নির্যাতন ভোগকারী আর কোন রাজনৈতিক নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। কিন্তু এরই পাশাপাশি একথাও সত্য যে, নেলসন ম্যান্ডেলাকে কোন বিচারের মাধ্যমে কখনো মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। তাঁকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য অথবা তাঁর উপর কোন প্রকার স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করার জন্য তাঁর কোন কবর ও কখনো খোঁড়া হয়নি। যা বঙ্গবন্ধুর বেলায় করা হয়েছে। কিন্তু তার পরেও দুর্দমনীয় এবং অপ্রতিরোধ্য মুজিবের মনে কোন প্রকার ভীতি সঞ্চার করা যায়নি অথবা কোন ভয় ভীতির উদ্রেক করা যায়নি। তাই ইতিহাসের আলোকেই মহান বাঙালি জাতির পিতা মুজিব যে কোন বিবেচনাতেই একজন মৃত্যুঞ্জয়ী বীর বটেন।

(২২) একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিব ছিলেন আপাদমস্তক জাতীয়তাবাদী একজন তুখোড় এবং সংগ্রামী নেতা। তিনি কোন বিপ্লবী কিংবা কমিউনিস্ট নেতা ছিলেননা। তিনি ছিলেন নির্ভীক, অসীম সাহসী এবং স্পষ্টবাদী। তিনি underground রাজনীতিতে বিশ্বাসী কিংবা অভ্যস্ত ছিলেননা। তাই গ্রেফতার এড়িয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোকে তিনি অপছন্দ করতেন। উপরন্তু তিনি ছিলেন আইনের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাসী, শ্রদ্ধাশীল এবং নিবেদিত প্রাণ। সারা জীবন ধরে অসংখ্যবার কারাবরণকারী বঙ্গবন্ধু যে কোন প্রকার মামলা মোকদ্দমাকে আইনানুগভাবে মোকাবেলা করতে অভ্যস্ত ছিলেন। আইন আদালতের প্রতি বঙ্গবন্ধুর এহেন শ্রদ্ধা এবং আনুগত্যের ব্যাপারে তিনি নিজেই তাঁর লিখিত বইয়ে বিবৃত করেছেন- “… আমি সরকারী গাড়ি ছেড়ে দিয়ে রিকশা ভাড়া করে বাড়ির দিকে রওয়ানা করলাম। দেখলাম, কিছু কিছু পুলিশ কর্মচারী আমার বাড়ি পাহাড়া দিচ্ছে। আমি রিকশায় পৌঁছালাম, তারা বুঝতে পারে নাই। রেণু আমাকে খেতে বলল, খাবার খেয়ে কাপড় বিছানা প্রস্তুত করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব এহিয়া খান চৌধুরীকে ফোন করে বললাম, “আমার বাড়িতে পুলিশ এসেছিল, বোধহয় আমাকে গ্রেফতার করার জন্য। আমি এখন ঘরেই আছি গাড়ি পাঠিয়ে দেন।” তিনি বললেন, “আমরা তো হুকুমের চাকর। গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি, আপনি প্রস্তুত হয়ে থাকুন। আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য বারবার টেলিফোন আসছে।” আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন ছেড়ে দিলাম। রেণু আমার সকল কিছু ঠিক করে দিল এবং কাঁদতে লাগল। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। ওদের উঠাতে নিষেধ করলাম। রেণুকে বললাম, “তোমাকে কি বলে যাব, যা ভাল বোঝ কর, তবে ঢাকায় থাকলে কষ্ট হবে, তার চেয়ে বাড়ি চলে যাও।“… আধা ঘণ্টা পরে গাড়ি এসে হাজির। অনেক লোকই বাড়িতে ছিল, গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে অনেকেই অন্ধকারে পালিয়ে গেছে। আমি গাড়িতে উঠে রওয়ানা করলাম।”

“… জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে আমাকে নিয়ে আসা হল। তিনি বসেই ছিলেন, আমাকে বললেন, “কি করব বলুন! করাচি আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য পাগল হয়ে গেছে। আমরা তো জানি আপনাকে খবর দিলে আপনি চলে আসবেন। জেলের ভয় তো আপনি করেননা।” তার কাছে অনেক টেলিফোন আসছিল, আমার আর তার কামরায় থাকা উচিত না। তাকে বললাম, “আমাকে জেলে পাঠিয়ে দেন। খুবই ক্লান্ত, গত রাতে ও ঘুম হয় নাই প্লেনে [সূত্রঃ অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান; ৬ষ্ঠ মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা নং- ২৭১-২৭২]।

সুতরাং ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুর স্বেচ্ছা বন্দিত্ব (wilful imprisonment) নিয়ে যে সমস্ত জ্ঞানপাপীগণ বিভিন্ন ধরনের অযুক্তি, কুযুক্তি এবং মিথ্যাচার করে তাঁর নির্মল ও পরিচ্ছন্ন চরিত্রে কালিমা লেপন করতে চান- মহাত্মা গান্ধী এবং নেলসন ম্যান্ডেলার উপরোক্ত জলজ্ব্যান্ত দৃষ্টান্তসমূহের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর নিজের বইয়ের উপরোল্লিখিত উদ্ধৃতির আলোকে তারা এহেন কুৎসা রটানো থেকে বিরত থাকতে পারেন এবং তাদের বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা চেতনার অবসান ঘটাতে পারেন।

(২৩) বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের আপামর জনতা জীবনের মায়া ত্যাগ করে মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের অত্যন্ত নিখুঁত এবং নির্ভুল পথিকৃৎ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁরই সুদক্ষ পরিকল্পনা এবং সুচিন্তিত ও সুদূরপ্রসারী দিক নির্দেশনার আলোকে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে এবং খুবই পরিচ্ছন্ন ও সুচারুভাবে রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। প্রসঙ্গক্রমে বলা আবশ্যক যে, পাকিস্তান সরকার তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে সবসময়ই গর্ব করতেন। সুযোগ পেলেই সরকারের বিভিন্ন কর্তা ব্যক্তিগণ তাদের প্রশিক্ষিত এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বীরত্ব গাঁথা জাহির করতে পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। কিন্তু অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার হলো যে, এই সমস্ত বীর পুঙ্গব সেনা সদস্যগণ লুঙ্গি কাছা দিয়ে পরা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে চরমভাবে পরাজিত এবং নাস্তানাবুদ হন। ফলে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সেনানায়ক জেনারেল এ এ খান নিয়াজী তার নেতৃত্বাধীন ৯৩ হাজার সৈন্য সহ আত্মসমর্পণ করেন। তাদের এহেন আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালি জাতির শৌর্য বীর্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

(২৪) বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং দারুণভাবে প্রশিক্ষিত এবং বিভিন্ন ধরনের আধুনিক মারণাস্ত্রে সুসজ্জিত বিপুল সংখ্যক সেনা সদস্যদের সাথে নয় মাস ব্যাপী বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে বাঙালি জাতি বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। এহেন অবস্থায় সম্মুখ যুদ্ধে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনকভাবে পরাজিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯৭১ -এর ১৬ই ডিসেম্বর তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তাদের এহেন আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। তাই এই ১৬ই ডিসেম্বর বীর বাঙালির জীবনে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যময় দিন। বাঙালির ইতিহাসে এই দিন মহান বিজয় দিবস। এই গৌরবান্বিত বিজয় দিবসের ভিতর দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের অপরিমেয় রক্ত এবং দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতি ছিনিয়ে আনে তাদের বহুল প্রত্যাশিত এবং বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালির রক্তস্নাত লাল সবুজ পতাকা।

(২৫) রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি মাত্রই জানেন কতিপয় কুলাঙ্গার এবং দেশদ্রোহী বেঈমান ব্যতিরেকে সমস্ত জাতি সক্রিয়ভাবে কোন না কোনভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশমাতৃকার টানে শহীদ হয়েছেন। আবার কেউবা নৈতিকভাবে, আর্থিকভাবে এবং অন্যান্য বিভিন্নভাবে কখনো প্রত্যক্ষ, আবার কখনোবা পরোক্ষভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। আর এহেন যুদ্ধ পরিচালিত হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অধীনে। কেননা এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়া তখন অন্য কোন দলের কোন কর্তৃত্ব কিংবা এক্তিয়ার অথবা কোন ম্যান্ডেটই ছিল না। তাই একথা ঐতিহাসিকভাবেই সত্য যে, অগণিত বীরের রক্ত স্রোত, অসংখ্য মাতার অশ্রু ধারা এবং বিপুল সংখ্যক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করেছে তাদের মহান স্বাধীনতা।

(২৬) অত্যন্ত অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বর্তমানে বাংলাদেশে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল রাজনীতির মাঠে বিরাজমান রয়েছে, তন্মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি, জাসদ, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং গণফোরাম সহ আরও অনেক বিরোধী দল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আদৌ আত্মপ্রকাশই করেনি। বিগত ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপরোক্ত কোন একটি দলের আদৌ জন্মই হয়নি। তাই দলীয়ভাবে উপরোক্ত কোন একটি দলের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রণের কোন সুযোগ কিংবা অবকাশই ছিল না। তবে একথা সত্য যে ঐ সমস্ত দলের অনেক নেতা, কর্মী এবং সমর্থক ১৯৭১ সনে আওয়ামীলীগের কোন একটি অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই ঐ সময়ে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী হিসেবেই তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশ স্বাধীনের অনেক পরে তাদের কেউ কেউ নতুন দল গঠন করেছেন। আবার কেউবা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী মূল দল আওয়ামী লীগেই রয়ে গিয়েছেন।

(২৭) আজ গলা ফাটিয়ে কিংবা আঙ্গুল উঁচিয়ে অথবা টেবিল চাপড়ে ইনিয়ে বিনিয়ে যিনি বা যারা যত গরম গরম কথাই বলেন না কেন, একথা সত্য যে, আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং পুরো দেশবাসী তথা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তাই কেউ মানুন আর না ই মানুন, স্বীকার করুন কিংবা না ই করুন, স্বাধিকার হারা বাঙালির মৃত্যুঞ্জয়ী নেতা বঙ্গবন্ধুই আমাদের মহান বাঙালি জাতির জনক বটেন। এমন একজন সুমহান নেতার আজন্ম লালিত স্বপ্ন সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে তথা জ্যোতির্ময় নক্ষত্র–মানব বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের অত্যুজ্জ্বল এবং অবিনাশী আলোকের প্রভায় অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতি তাদের কাঙ্ক্ষিত এবং বাঞ্ছিত স্বাধীনতা পেয়েছে। মরণপণ যুদ্ধে বীর বিক্রমে লড়াই করে তারা বিজয় অর্জন করেছে। একথা দিবালোকের মতো সত্য যে, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর কোন বিকল্প কিংবা সমতূল্য অথবা সমকক্ষ আর কেউই ছিলেন না এবং হয়তোবা কোনদিন হবেন ও না।

(২৮) বঙ্গবন্ধু মুজিবের কট্টর সমালোচনাকারীগণ ও অকপটে স্বীকার করেন যে অসীম সাহস, অপরিসীম ত্যাগ তিতিক্ষা এবং অতুলনীয় দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যে কোন ধরনের বিবেচনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের অবিনশ্বর এবং অকুতোভয় বীর বঙ্গবন্ধু। তাঁর সামগ্রিক চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা এবং হৃদয় মন জুড়ে ছিল বাঙালি জাতির সামগ্রিক কল্যাণ এবং সমৃদ্ধি। তাঁর যত স্বপ্ন ছিল তা ছিল এই বাংলাদেশকে ঘিরে। নিজের সাধ-আহ্‌লাদ সবই তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন এই বাংলাদেশের জন্য। সদা সর্বদা তিনি দেশ ও জাতির সর্বাত্মক কল্যাণ এবং সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করেছেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের নিমিত্তে তাঁর জীবদ্দশায় সকল ক্ষেত্রেই তিনি ভিত গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর গতিশীল এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশের সামনে ছিল অপার সম্ভাবনাময় আগামীর মহাযাত্রা।

(২৯) একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বাঙালির গৌরবদীপ্ত মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। কারাবন্দী থাকাবস্থায় প্রহসনমূলক গোপন বিচারের রায়ে ১৯৭১ -এর আগস্ট মাসে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে সে রায় পাকিস্তান সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেননি। পরবর্তীকালে বাঙালির সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত এবং পরাজিত হয়। তাদের এহেন পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা বিজাতীয় শাসন এবং শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি প্রদানের জন্য পাকিস্তানের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ক্রমাগত আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তান সরকার বিগত ১৯৭২ সনের ৮ই জানুয়ারি তাদের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। এহেন মুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের নির্জন কারা প্রকোষ্ঠে একটানা দীর্ঘ নয় মাস চৌদ্দ দিন মৃত্যুর প্রহর গোণা বঙ্গবন্ধুর জেল জীবনের অবসান ঘটে। অতঃপর পাকিস্তান থেকে সরাসরি লন্ডন এবং পরে দিল্লী হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বিজয়ী বীরের বেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্ন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

(৩০) বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বৃটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর কমেট বিমানটি বাংলার মাটি স্পর্শ করে ঐ দিন দুপুর ০১-৫১ মিনিটে। বিমানে সিঁড়ি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ পুষ্পমাল্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে ছুটে যান। জাতির জনককে মাল্যভূষিত করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সংযমের সকল বাঁধ ভেঙ্গে যায়। তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তাই ভাষায় বর্ণনা করা অত্যন্ত কঠিন এবং দুরূহ। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন। তাঁর মুখাবয়বে তখন স্বজন হারানোর সুস্পষ্ট ছাপ, হৃদয়-মন ভারাক্রান্ত, চোখ দুটি অশ্রুসজল। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রফুল্ল বদনে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি দৃশ্যমান। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরই পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ মানুষ গগনবিদারী স্লোগান, মুহুর্মুহু করতালি এবং স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাসের মাধ্যমে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেয় তাঁর প্রিয় স্বদেশভূমি। অতঃপর দেশের মুক্ত মাটিতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন পুরুষোত্তম শেখ মুজিব।                                                                                                                        

ড. মোঃ ফজলুর রহমান,সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ) , লেখক ও কলামিস্ট 

(চলমান)

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »