মঙ্গলগ্রহে নাসার মনুষ্যবিহীন রোবট রকেট মার্স-রোভার পারসিভেয়ারেন্স-এর সফল অবতরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ গতকাল বৃহস্পতিবার ১৮  ফেব্রুয়ারী বৃটিশ গ্রিণিচ মান সময় রাত ৯ টার কয়েক মিনিট পূর্বে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্য দিয়ে এই ছোট মহাকাশযানটি “লাল গ্রহে” অর্থাৎ মঙ্গলগ্রহে সফলভাবে অবতরণ করেছে। লন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়,ছয় চাকার ছোট এই মহাকাশযান পারসিভেয়ারেন্স যখন মঙ্গলগ্রহের একটি গর্তে অবতরণ করে তখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের রাজধানী লস অ্যাঞ্জেলেসের পাসাডেনায় নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির মিশনের পরিচালনাকারীরা করতালি ও চিয়ার্সে ফেটে পড়েন।

অবতরণের সময় পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে মহাকাশযানটির রেডিও সংকেতগুলি নিশ্চিত করে যে,ছয় চাকাযুক্ত রোভারটি বিপজ্জনক অবতরণ থেকে বেঁচে গিয়েছিল এবং জেরাজোর ক্র্যাটারের ভিতরে তার লক্ষ্য অঞ্চলে সফল অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এই পারসিভেয়ারেন্স রোবোটিক যানটি প্রায় সাত মাস ধরে মহাকাশের ২৯৩ মিলিয়ন মাইল (৪৭২ মিলিয়ন কিলোমিটার) পথ পাড়ি দিয়ে মঙ্গলগ্রহের মার্টিয়ান বায়ুমণ্ডলে পৌঁছায়। সেখান থেকে এটি ঘন্টায় ১২,০০০ হাজার মাইল (প্রতি ঘন্টা ১৯,০০০ কিলোমিটার) গতিবেগে মঙ্গলগ্রহের বায়ুমণ্ডল বেদ করে মঙ্গলগ্রহের ভূমিতে অবতরণ করে। মহাকাশযানটি মঙ্গলের ভূমি স্পর্শ করার কয়েক মুহুর্ত পরে, পৃথিবীর কেন্দ্রে প্রথম কালো-সাদা মঙ্গলগ্রহের ভূমির ছবি পাঠায়।

ছবি অনুযায়ী মহাকাশযানটি একটি মঙ্গলগ্রহের একটি গর্তে নির্জন ও পাথুরে স্থানে সফলতার সাথে অবতরণ করে। মঙ্গলগ্রহ থেকে পৃথিবীতে রেডিও তরঙ্গ আসতে ১১ মিনিট সময় লাগে। তাই পৃথিবীর কেন্দ্রের লোকজন দেখার ১১ মিনিট পূর্বেই সেটি মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠে অবতরণ করেছিল। নাসার কর্মকর্তারা জানান,অবতরণের পূর্বের শেষ সাত মিনিট ছিল আমাদের জন্য এক শ্বাসরুদ্ধকর ও উত্তেজনাপূর্ণ মুহুর্ত। “এটি সত্যই একটি নতুন যুগের সূচনা”।

বিজ্ঞানের জন্য নাসার সহযোগী প্রশাসক, টমাস জুরবুচেন নাসার অনুষ্ঠানের ওয়েব  কাস্টের আগের দিন বলেছিলেন, প্রায় দুই বৎসর পূর্ব থেকে পরিকল্পিত এই মিশনের বাজেট ২,৭ বিলিয়ন ডলার। পারসিভেয়ারেন্স এর এই সফল অবতরণের ফলে এখন এই মিশনের আসল উদ্দেশ্য বা পরীক্ষা সফল হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

এই মিশনের আসল উদ্দেশ্য হ’ল মঙ্গলগ্রহের মাটি ও পাথর পরীক্ষা করে দেখা যে, মঙ্গলগ্রহে অতীতে কোন প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কিনা তার অনুসন্ধান করা। মঙ্গলগ্রহে কিন্ত ইতিপূর্বের অভিযানে এবারের মত এত উন্নত যন্ত্রপাতি নিয়ে কোন গ্রহে বৈজ্ঞানিক মিশন পাঠানো হয়নি। এইবারই প্রথম মঙ্গলগ্রহের একটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনাময় স্থানকে টার্গেট করে  রোবট নামানো হয়। যেখানে এই মহাকাশ রোবটি মঙ্গলপৃষ্ঠের মাটি স্পর্শ করেছে,এই স্থানটি হ’ল জেযেরো ক্রেটার। একসময় এই গহ্বরের স্থানটিতে বিশাল একটি হ্রদ থাকার লক্ষণ উপগ্রহে পাওয়া ছবি থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। তাদের ধারণা এই হ্রদটিতে প্রচুর পানি ছিল এবং সম্ভবত সেখানে জীবনও ছিল। পারসিভেয়ারেন্স যেখানে অবতরণ করেছে সেই জেযেরো গহ্বরের ধুলাবালুর মধ্যে থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে রোবট যানটি, যা বিশ্লেষণ করে দেখা হবে গ্রহটিতে অতীতে জৈব কোন কর্মকাণ্ডের হদিস ছিল কিনা। সবচেয়ে লক্ষণযুক্ত ও সম্ভাবনাময় নমুনা পৃথিবীতে পাঠানো হবে ভবিষ্যত মিশনের প্রস্তুতির জন্য।

মহাকাশযানটি মঙ্গলের মাটিতে অবতরণের পূর্বে নাসায় এক সাক্ষাৎকারে পারসিভেয়ারেন্সের উপ প্রকল্প ম্যানেজার ম্যাট ওয়ালেস বলেন, “কিন্তু মঙ্গলের পৃষ্ঠে ভবিষ্যতের মিশন পাঠানোর আগে আমাদের আগে মঙ্গলে ঠিকমত অবতরণ করতে হবে। আর সেটাই সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।” অবতরণের পর পারসিভেয়ারেন্সের উপ প্রকল্প ম্যানেজার ম্যাট ওয়ালেস সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন,এখন আমরা আমাদের পরীক্ষা চালিয়ে যাবো। তিনি আরও বলেন “মহাকাশ মিশনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হল সফল অবতরণ। মঙ্গলগ্রহে এর আগে যেসব মিশন পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে ৫০ শতাংশ যান মঙ্গলের পিঠে সফলভাবে অবতরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই আমাদের এইবারের রোবট মহাকাশযানটির জেযেরো গহ্বরে সফল অবতরণ আমাদের জন্য তথা আধুনিক বিজ্ঞানের জন্যও এক বিরাট মাইল ফলক হয়ে থাকবে।

মঙ্গলগ্রহে এই পর্যন্ত নভোযান অবতরণের ১৪টি প্রচেষ্টা আগে নেয়া হয়েছিল,এর মধ্যে সফল হয়েছে আটটি আর এর সবগুলোই  ছিল আমেরিকান মিশন। তবে ১৯৯৯ সালে একবার নাসার মঙ্গল মিশন ব্যর্থ হয়েছিল।

কবির আহমেদ /ইবি টাইমস

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »