সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক

মুক্তিযুদ্ধ,স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে ড.  মোঃ ফজলুর রহমানের ধারাবাহিক মতামত। এটি লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে ইউরোবাংলা টাইমসের সম্পাদকীয় নীতিমালার সম্পর্ক নেই

পর্ব- ৫

ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ (৩৮)উপরোল্লিখিত ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত বক্তব্য অনুযায়ী একথা অনস্বীকার্যভাবেই প্রমাণিত হয় যে, ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু মুজিব নিজে স্বয়ং ঢাকাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত ঘোষণার আলোকে ২৬শে মার্চকেই আমরা আমাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে থাকি। পক্ষান্তরে জিয়াউর রহমান নিজে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ১৯৭১ সনের ২৭শে মার্চ সন্ধ্যা ৭-০০ টার দিকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছেন মাত্র। ঐ তারিখের পরে আরও একাধিকবার জিয়াউর রহমানের এহেন ঘোষণা উক্ত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকেই প্রচারিত হয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে, জিয়াউর রহমানের এহেন ঘোষণার মাধ্যমেও দেশ এবং জাতি বহুলাংশে উজ্জীবিত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছে। এরই পাশাপাশি একথাও সত্যি যে, উপরোক্ত ঘোষণার সময়ে তিনি (জিয়াউর রহমান) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছেন-

“I, Major Ziaur Rahman do hereby declare the independence of Bangladesh on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman.”

(৩৯)বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজে স্বয়ং ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে, দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন লেখালেখিতেও তার স্বীকারোক্তি রয়েছে। এতদসংক্রান্ত ব্যাপারে জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান (এ, এ, খান) নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা তৎকালীন মেজর সিদ্দিক সালিক তার Witness to Surrender -গ্রন্থে পরিচ্ছন্ন ভাষায় উল্লেখ করেছেন-

When first shot has been fired, the voice of Sheikh Mujibur Rahman came faintly through a wave length close to that of official Pakistan Radio. In what must have been and sounded like, a pre-recorded message, the Sheikh proclaimed East Pakistan to be the People’s Republic of Bangladesh. [দ্রঃ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা- অধ্যাপক ড. এ. কে. আজাদ চৌধুরী, উপাচার্য (প্রাক্তন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সূত্র- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৬৫৭]।

(৪০)মেজর সিদ্দিক সালিকের উপরোক্ত বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন জনাব মাসুদুল হক। তিনি বইটির নামকরণ করেছেন “নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল” (নভেল পাবলিকেশন্স, ১৯৮৮)। এই বইয়ের ৮৫ নং পৃষ্ঠায় তিনি বর্ণনা করেছেন- “যখন প্রথম গুলিটি বর্ষিত হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান রেডিওর সরকারী তরঙ্গের (ওয়েভ লেংথ) কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মনে হলো ঐ কণ্ঠের বাণী আগেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করলেন।”

(৪১)মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন, “বেলুচিস্তানের কসাই” বলে খ্যাত জেনারেল টিক্কা খান। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে পাকিস্তান সফরকারী এক বাঙালি সাংবাদিকের কাছে তিনিও (টিক্কা খান) বলেছেন যে- “শেখ মুজিবের কণ্ঠস্বর তিনি চিনতেন এবং ২৬শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা যে বঙ্গবন্ধুরই ছিল, তিনি সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন [দ্রঃ ইতিহাসের আলোকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, মুসা সাদিক, জনকণ্ঠ, ৪ঠা এপ্রিল, ২০০২; “শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম”, আতিউর রহমান, পৃঃ- ১২২]

(৪২)স্বীকৃত মতেই জেনারেল টিক্কা খান কোন বাঙালি ছিলেন না কিংবা তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ছিলেন না। উপরন্তু তিনি ছিলেন বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি এবং বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চির শত্রু। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার বক্তব্যের মাধ্যমে ও স্বীকৃত এবং প্রমাণিত হয় যে, জিয়াউর রহমান নহেন বরং বঙ্গবন্ধু মুজিব নিজে স্বয়ং ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।

(৪৩)অতি মাত্রায় শ্রুতিকটু এবং অত্যন্ত দৃষ্টিকটু হলেও সত্যি যে, আজ কোন কোন মহল হিমালয় সম উচ্চতার মুজিবের পাশে অথবা তাঁরই সমান্তরালে আবার কখনোবা তাঁর চেয়েও উপরে জিয়াউর রহমানকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে চলেছেন। আর তা করতে গিয়ে কোন প্রকার লাজ শরমের তোয়াক্কা না করে, বিভিন্ন ধরনের অতিরঞ্জন, অতিকথন ও কল্প কাহিনীর অবতারণা করা হচ্ছে। এহেন অবস্থায় নিতান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেতভাবেই বঙ্গবন্ধুকে খাটো বা হেয় করে দেখানো হচ্ছে। এরই পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী এবং এই যুদ্ধে অত্যন্ত সফলভাবে নেতৃত্বদানকারী সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দকে পাশ কাটিয়ে কিংবা সুকৌশলে তাঁদেরকে এড়িয়ে গিয়ে তদস্থলে জিয়াউর রহমানকে মাত্রাতিরিক্তভাবে বড় করে দেখানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতদসংক্রান্ত সমুদয় কার্যক্রম যে কোন বিবেচনায়ই প্রকৃত সত্য ও সঠিক তথ্য তৎসহ ইতিহাস বিকৃতি বটে। যা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক।

(৪৪)একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি যে, বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দান করেছেন তৎকালীন প্রবাসী মুজিবনগর সরকার। স্বীকৃত মতেই ঐ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজ উদ্দিন আহমেদ। এরই পাশাপাশি মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ছিলেন এম, মুনসুর আলী, কামরুজ্জামান এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এছাড়া প্রধান সেনাপতি ছিলেন কর্নেল (পরবর্তীকালে জেনারেল) আতাউল গণি ওসমানী। এছাড়া উপ প্রধান সেনাপতি ছিলেন এয়ার কমোডর এ, কে, খন্দকার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে উপরোক্ত জাতীয় নেতাদের অবদান ও আত্মত্যাগ অত্যন্ত বিপুল, বিশাল এবং অপরিসীম।

(৪৫)অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো যে, স্বাধীনতা বিরোধী এবং সুবিধাবাদী কতিপয় কুবুদ্ধিজীবী উপরোল্লিখিত অতি উচ্চ মার্গের সকল জাতীয় নেতাদের অবদানকে পাশ কাটিয়ে কিংবা তাঁদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে ম্লান করার পাশাপাশি অন্যান্য সকল সেক্টর কমান্ডারদের বীরোচিত অবদানের ব্যাপারে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পূর্বাপর সম্পূর্ণভাবে নিরব, নিশ্চুপ এবং নির্বিকার থাকেন। পক্ষান্তরে বাঙালির স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কতিপয় অপশক্তি অত্যন্ত জঘন্য এবং কুৎসিত মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে, সুপরিকল্পিতভাবে বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমানকে তাঁর অন্ধ এবং অর্বাচীন অনুসারীগণ হিমালয় তুল্য মুজিবের সম কাতারে নিয়ে আসতে চান। যা’ নিদারুণভাবে নিন্দনীয় এবং গর্হিত অপরাধ বলে জোরালোভাবেই বিবেচিত হয়। উপরন্তু তাদের এহেন দুরভিসন্ধিমূলক অপপ্রয়াস একদিকে যেমন দৃষ্টিকটু ও শ্রুতিকটু ঠিক তেমনই তা সুপরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতি ও বটে।

(৪৬)১৯৭০ সনের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এবং তার নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের বিভিন্ন কার্যক্রম সমূহ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়াও মার্কিন, বৃটিশ, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন অত্যন্ত গভীর এবং তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের কারও গোয়েন্দা তৎপরতায় কখনো ধরা পড়েনি যে, তৎকালীন মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। পক্ষান্তরে উপরোক্ত সব কয়টি গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম এবং পর্যবেক্ষণেই ধরা পড়েছে এবং পরবর্তীকালে তারাও অসংকোচে এবং অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বাঙ্গালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিব নিজেই তাঁর গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে তথা ২৬শে মার্চের প্রত্যুষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।                                                                                                                                    

ড. মোঃ ফজলুর রহমান,সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট 

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »