আজ ভোলা জেলার সাবেক দুই জাতীয় সংসদ সদস্যের মৃত্যুবার্ষিকী

সাব্বির আলম বাবু ভোলাঃ ভোলা জেলার লালমোহনের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য এমপি মোতাহার উদ্দিন মাষ্টার ও সাবেক এমএলএ ডাক্তার আজাহার উদ্দিনের আজ ১০ জানুয়ারী মৃত্যবার্ষিকী। মোতাহার উদ্দিন মাষ্টার লালমোহন ও চরফ্যাশনের একাংশ নিয়ে গঠিত তৎকালিন বাকেরগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মোঃ মোতাহার উদ্দিন মাষ্টারকে ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারী ঘাতকরা হত্যা করে। যে খুনের রহস্য আজো অজানা। তার বাড়ি লালমোহনের গজারিয়ায়। একজন স্কুল মাস্টার থেকে যে কিনা ধাপে ধাপে সংসদ সদস্য হয়ে জনগণের জন্য কথা বলতে পেরেছেন, সেই হচ্ছেন মোঃ মোতাহার উদ্দিন মাস্টার। যার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম কোন সংসদ সদস্য আততায়ীর হাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো।

মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের পিতা মৌলভী সুলতান আহমেদ মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। মাতা আছিয়া খাতুন ছিলেন ধার্মিক গৃহিণী। ৬ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে মোতাহার উদ্দিন মাস্টার ছিলেন সবার বড়। ১৯৩৫ সালের ২৪ আগস্ট জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। ইংরেজীতে অসাধারণ দক্ষতা থাকায় তার নিজ এলাকা গজারিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ১৯৬২ সালে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন এবং ওই বছরই ইউপি সদস্য থেকে মৌলিক গণতন্ত্রের প্রয়োগে ৯জন মেম্বারের প্রত্যক্ষ ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পর পর দুইবার চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচিত হন তিনি,কিন্তু পাকিস্তানী সরকার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা না দিয়ে তালবাহানা করায় দেশ স্বাধীনের ডাক পড়ে। সে ডাকে সারা দেন মোতাহার উদ্দিন মাস্টারও। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনে তিনি গজারিয়া থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দিক পরামর্শ দিয়ে সংগঠিত করে তোলেন। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনে তিনি গজারিয়া থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দিক পরামর্শ দিয়ে সংগঠিত করে তোলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয় পাকবাহিনী। তারা মোতাহার মাস্টারের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে হত্যার জন্য খুঁজতে থাকেন। পরে না পেয়ে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে উল্লাস করে  পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। যুদ্ধকালীন সেই নৃশংসতার পোড়া চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের বাড়ি থেকে।

যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি ঘুইংগারহাট, বাংলাবাজার যুদ্ধ, চরফ্যাশন থানা দখল,  ওসমানগঞ্জের যুদ্ধ ও লালমোহন থানা দখল করার সময়ে তিনি স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং সম্মুখ যোদ্ধাদের পরামর্শ দিয়ে ধন্য করেছেন। আবার যখন পাকবাহিনী সাঁড়াশী অভিযান চালায় তখন তিনি গভীর রাতে বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে গিয়ে আত্মগোপন করেন। এর মধ্যে তিনি ইলিশা কান্দি আব্দুল জব্বার মাতাব্বর বাড়ি, পাঙ্গাসিয়া মাতাব্বর বাড়ি, পাঙ্গাসিয়া মুসলিম উদ্দীন হাওলাদার বাড়ি, লতিফ চেয়ারম্যান বাড়ি, পশ্চিম চরউমেদ পেশকার বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মোঃ মোতাহার উদ্দিন মাস্টার এমপি হয়ে এলাকার মানুষের কাছের মানুষ থেকে তিনি হয়ে যান পুরো ভোলার জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন। যে কোন সমস্যা নিয়ে তার কাছে মানুষ আসলে সহজ সমাধান পেত, পেত ন্যায় বিচার। কারো সাথে আপোষ ছিলনা তার নীতিতে। গজারিয়া বাজারে ইউনিয়ন পরিষদে তিনি অত্যান্ত দক্ষতার সাথে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন,আর এটাই কাল হয়ে যায় তার জীবনে ।

ডাঃ আজাহার উদ্দিনঃ

ডাঃ আজাহার উদ্দিন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের পিতা সাবেক এমএলএ ডাঃ আজাহার উদ্দিন ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারী বার্ধক্যজণিত কারণে বরিশাল হাসপাতালে মৃত্যবরণ করেন। ডাঃ আজহার উদ্দিন ১৯১৩ সালের ১৩ অক্টোবর ভোলা জেলার দৌলতখাঁন উপজেলার উত্তর নেয়ামতপুরের চর কাকড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল মরহুম গোলাম রহমান পাটোয়ারী। ছোটকালেই পিতা-মাতার সাথে লালমোহন চলে আসেন তিনি। ১৯২৪ সালে তিনি লালমোহন মাইনর স্কুল থেকে প্রাথমিক বৃত্তি, ১৯২৭ সালে একই স্কুল থেকে জুনিয়র বৃত্তি লাভ করেন। এরপর ১৯৩৩ সালে ভোলা গভর্ণমেন্ট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক ও ১৯৩৬ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে তিনি প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। ১৯৪০ সালে এলএমএফ (লাইসেনশিয়েট অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) পাস করে কোলকাতা ক্যাম্বেল হাসপাতালে কর্মজীবন শুরু করেন ডাঃ আজাহার উদ্দিন। কর্মজীবনে তিনি কলিকাতা ক্যাম্বেল, ঢাকা মিটফোর্ড, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও কক্সবাজার হাসপাতালে বিভিন্ন স্তরে সফলতার সাথে চাকুরী করেন। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করে প্রাইভেট প্র্যাকটিস আরম্ভ করেন তিনি। এসময় তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তিনি ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে বর্তমান লালমোহনসহ ভোলার দক্ষিণাঞ্চলের এবং সাবেক বাকেরগঞ্জ নামের একটি আসন থেকে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয়বার প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন এবং বিরোধী দলীয় ডেপুটি লীডার হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একই আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমপি) নির্বাচত হন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় লালমোহনে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও লালমোহনে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু করণে তাঁর ব্যাপক অবদান ছিল। শেষ বয়সে তিনি বরিশালে ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন, ভোলা জনকল্যাণ সমিতি এবং বরিশালে অন্যান্য জনকল্যাণ মূলক কাজে সম্পৃক্ত হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ছিলেন। তার ছেলে মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের অবদান স্বরূপ বীর বিক্রম উপাধী লাভ করেন। পরে তিনিও ভোলা-৩ আসন থেকে পর পর ৬ বার এমপি নির্বাচিত হন এবং সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়ীত্ব পান।

EuroBanglaTimes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »